মেলবোর্ণ-যাত্রীর ডায়েরী –পর্ব২

meborn 2

সৈয়দ আলমাস কবীর: মেলবোর্ণ শহরটি বেশ সুন্দর ও ছিমছাম। লোকজন কম, ঢাকা শহরের প্রায় অর্ধেক। অথচ আয়তনে বিচার করলে ৩৩টা ঢাকার সমান ভিক্টোরিয়া প্রদেশের এই রাজধানী শহর। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ ভাল।

ট্রামে-বাসে করে মানুষ খুব সাচ্ছন্দে যাতায়াত করে থাকে। একটু দূরের জন্য ট্রেন তো রয়েইছে। শহরের বুক চিরে বয়ে গিয়েছে ইয়ারা নদী। নদীর দুই পাড়ে রয়েছে বোর্ডওয়াক, আর তার ওপর আছে বেশ কিছু রেস্তোঁরা আর পানশালা। সিবিডি বা কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় (আমাদের মতিঝিল) রয়েছে বেশ কিছু আকাশচুম্বী অট্টালিকা। এর মধ্যে ৯১ তলার ইউরেকা টাওয়ার-টি সবচাইতে উঁচু, প্রায় ৯৭৫ ফুট লম্বা। অন্যান্য শহরের ব্যবসায় পাড়ায় খুব একটা খালি জায়গা দেখা যায় না। কিন্তু মেলবোর্ণের সিবিডি-তে বেশ কয়েকটা পার্ক রয়েছে। পার্ক মানে রেলিং দিয়ে ঘেরা দু-এক বিঘা মাঠ নয়! কয়েক একর জুড়ে গাছ-গাছালি সহ মনোরম পরিবেশে নিয়ে বিস্তৃত এসব পার্ক। লোকে কাজ করতে করতে পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে এই পার্কগুলোতে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকে বা শুয়ে একটু রোদ পোহায়। আমাদের মতিঝিলের পাশে গুলিস্তানেও একটা পার্ক আছে; বঙ্গভবনের ঠিক সামনে। পরবর্তীতে মাঝখান দিয়ে একটা রাস্তা বানিয়ে পার্কটাকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ঠিক জানিনা, সেই পার্কে এখন কেউ যায় কি না!

অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য শহরগুলোতে আগে বেশ ক’বার আসা হয়েছে আমার; তবে, মেলবোর্ণে এই প্রথম। সত্যি বলতে কি, সিডনী, ক্যানবেরা, গোল্ড কোস্ট ইত্যাদি জায়গাগুলো আহামরি কিছু লাগেনি আমার। সে তুলনায় মেলবোর্ণকে বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। একটা চারিত্র্য আছে এর। সব শহরের যেটা থাকে না। যেমন, এদেশের সবচেয়ে বড় শহর সিডনীর তেমন কোন বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নেই; একটা বড়, ব্যস্ত শহর মাত্র। মেলবোর্ণ সে হিসেবে বেশ সংস্কৃতি প্রবণ। এখানকার একটু পুরনো বাড়ীঘরগুলোর নির্মাণকৌশল বা রাস্তাঘাটের দেওয়াল-লিখন দেখলেই সেটা বোঝা যায়। বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় রক-ব্যাণ্ড এসি/ডিসি-কে উৎসর্গ করা একটি চোরাগলি আছে শহরের কেন্দ্রে। গলির দু’পাশের বাড়ীর দেওয়ালগুলো হয়ে উঠেছে ব্যাণ্ডের ছবি আর লোগো আঁকা বর্ণিল ক্যানভাস। হোজিয়ের লেন নামে আরেকটি গলি আছে খোদ ফেডেরেশন স্কোয়ারের সামনে। এখানেও স্প্রে-রঙ দিয়ে আঁকা ছবিগুলো থেকে শহরবাসীর মনের কথা জানা যায়। ছবিগুলোর মধ্যে নিছক আনন্দও আছে, আবার আছে চিন্তার খোরাক। আমাদের দেশে সুন্দর দেওয়াল লিখন আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। সব প্রচারণা পোস্টারে বা ব্যানারে। তা’ও যদি সেগুলো দৃষ্টিনন্দন হতো! আসলে আমরা সৃজনশীলতা হারিয়ে ফেলেছি। মুখস্থ করতে করতে মৌলিক কিছু করার ক্ষমতা আমাদের আর নেই। যতদিন না শিক্ষাব্যবস্থাটাকে কেচে গন্ডুস না করা হবে, আমরা গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েই চলতে থাকবো।

জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘মাস্টারশেফ আস্ট্রেলিয়া’-র শ্যুটিং এই মেলবোর্ণ শহরেই হয়ে থাকে। তিন-তিনবার মিশেলিন তারকা-বিজয়ী বিশ্বখ্যাত রন্ধনশিল্পী হেস্‌টন ব্লুমেন্‌থল এই অনুষ্ঠানে অনেকবার এসেছেন, আর সেই সুবাদে আমরা অনেকেই তাঁর কৌতূহলোদ্দীপক মজাদার সব রান্না সম্বন্ধে অবগত। সেই হেস্‌টন-এর রেস্তোঁরা ‘ডিনার বাই হেস্‌টন ব্লুমেন্‌থল’-এ টেবিল সংরক্ষিত করা ছিল আমাদের জন্য রাত ৮ঃ৪৫-এ। যথাসময়ে হাজির হলাম এই বিশ্বনন্দিত বাবুর্চীর হাতের ভেলকিবাজি চেখে দেখার জন্য। এখানে প্রত্যেকের জন্য বাঁধা ত্রি-ব্যাঞ্জণের সেট-মেনু। তালিকা থেকে একটি ক্ষুধা-উদ্রেককারী প্রারম্ভিক, একটি মূলব্যাঞ্জণ এবং একটি সমাপনী মিষ্টান্ন পছন্দ করে নিতে হবে। প্রত্যেকটি পদেরই একটা ঐতিহাসিক যোগাযোগ আছে।

১৫শ শতাব্দীর ‘মীট-ফ্র্যুট’ হলো হেস্‌টন-এর তৈরী একটা বিশেষ ধরণের অ্যাপেটাইজার। এসব উঁচুদরের রেস্তোঁরাগুলোতে পরিবেশন শৈলীটা বিশেষভাবে দ্রষ্টব্য। কমলালেবুর রসে ডোবানো এই মুরগীর কলিজা-ভর্তা দেখলে মনে হবে একটা সত্যিকারের কমলালেবু সামনে দেওয়া হয়েছে। ওপরে কমলার খোসার রঙ ও গ্রথনের আবরণ, আর ভেতরে কুক্কুটীয় যকৃৎ-মণ্ড। খেতে ভারী চমৎকার! শেঁকা রুটির ওপর পেস্টের মত এই মণ্ড মাখিয়ে খেলে মনে হবে স্বর্গীয় কোন খাবার খাচ্ছি! এই ‘মীট-ফ্র্যুট’ ছাড়াও হেস্‌টনের আরেক উল্লেখযোগ্য যাদু হচ্ছে আনারস পুড়িয়ে তৈরী ১৯শ শতাব্দীর ‘টিপ্‌সি কেক’। আমি হাঁসের মাংসের আরেকটি পদও নিয়েছিলাম। খেয়ে মনে মনে ঠিক করেছিলাম, এবার থেকে শীতকালে হাঁস এভাবেই রান্না করতে হবে। আমার স্ত্রী নিয়েছিলেন ওয়্যাগু বীফের একটি স্টেক।

জাপানী বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ার ওয়্যাগু প্রজাতির গরুকে শেষ ৩০০-৫০০ দিন ধরে শুধু শষ্যদানা খাওয়ানো হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে রেড ওয়াইনও খাওয়ানো হয় গরুগুলোকে। এই মাংস এতই মোলায়েম যে, মুখে দিলে গলে যায়! হেস্‌টনের ঐন্দ্রজালিক রন্ধনপ্রণালীতে মোহিত হয়ে তৃপ্তি ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বাড়ী ফিরলাম। ১৪২৬ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটা বেশ ভালই কাটলো বঙ্গদেশ থেকে ৯ হাজার কিলোমিটার দূরের এই শহরে।
(চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।