ইতালী-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ৩

aaqq

ভোর সাড়ে ছ’টায় এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। দেহঘড়ি কনফিউজড হয়ে ঢাকার সময়ের সাথে মিলিয়ে ৫ ঘন্টা আগেই তুলে দিল! রাত দেড়টায় চোখ খুলে বিছানায় বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। ঢেউ গুণতে গুণতে কখন যে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা, মোবাইলের ঘড়িতে সাড়ে ছ’টায় এলার্ম যখন বেজে উঠলো, ঘুম বাবাজিকে চোখ থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করে শয্যাত্যাগ করলাম।

৫-তারা হোটেলের নাস্তার আয়োজন আমার সবসময়ই বেশ পছন্দের। আজ তাড়াতাড়ি প্রাতঃরাশ সেরে প্রাতো শহরের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়লাম। বেড়িয়ে পড়লাম বললেই তো আর হলো না! এতো আর অন্য আর পাঁচটা শহর না, যে রাস্তায় বেড়িয়ে হাত তুলে ট্যাক্সী ডাকলেই দুয়ারে গাড়ী চলে আসবে। হোটেলের কন্সিয়ার্জ-কে দিয়ে ওয়াটার-ট্যাক্সী ডাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সেই জল-ট্যাক্সী নিয়ে এল ভেনিস শহরের কেন্দ্রে। সেখানে অপেক্ষা করছিলেন এক স্থানীয় ভদ্রলোক ল্যারী। তা’রই গাড়ীতে চেপে রওয়ানা হলাম প্রাতো আর ফ্লোরেন্স শহরের উদ্দেশ্যে।

ভেনিস শহরে জলপথে যাতায়াতটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এখানে খালগুলোতে ঢেউ থাকে বেশ। নৌকা থেকে ওঠানামাটা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার! আমি খালি ভাবছিলাম, এখানে যাদের সী-সিকনেস আছে, তা’দের কী উপায় হয়! যা’হোক, জলপথে যাতায়াতের ব্যবস্থাটা বেশ কার্যকর। আমাদের নদীমাতৃক দেশে এধরণের ব্যবস্থা কেন গড়ে ওঠেনি, অবাক হই। আজকাল ঢাকার হাতিরঝিলে ওয়াটার-ট্যাক্সী শুরু হয়েছে বটে, তবে এর আরও প্রচার দরকার, আর অন্যান্য জলপথগুলো চিহ্নিত করে সেসব জায়গায় এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা দরকার।

ইতালীর টাসকানি প্রদেশের ছোট একটা শহর প্রাতো। পর্যটক আকর্ষণ করার মত তেমন কিছু নেই এখানে। ঘন্টা খানেক ঘুরে আবার যাত্রা শুরু করলাম ফ্লোরেন্স শহরের দিকে। ইতালীয়রা এ শহরকে ‘ফিরেঞ্জে’ বলে ডাকে। টাসকানির রাজধানী হলো শহর। রেনেসাঁসের সময়কার সমৃদ্ধ শিল্প ও সংস্কৃতির কারণে ইউনেস্কো এটিকে বিশ্ব হেরিটেজ নগরী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ফ্লোরেন্সের ব্যাসিলিকা, ইটালিয়ান মার্বেলের তৈরী চার্চ, মাইকেলেঞ্জেলোর বিখ্যাত ডেভিড মূর্তির প্রতিরূপ, এবং অর্ণ নদীর ওপরে প্রাচীন সেতু, সব অবশ্য-দর্শনীয় স্থানগুলো কাছাকাছিই অবস্থিত। হেটে হেটে ঘুরে, ছবি তুলে পর্যটন-ফরজ পালন করলাম।

সকালের নাস্তা সেই কখন হজম হয়ে গেছে! ঠিক করলাম, টাসকানীয় ভোজ দিয়েই পাকস্থলীর প্রতিবাদ দমন করবো। TripAdvisor-এর সুপারিশ করা এক রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম বুক-ভরা আশা নিয়ে। খাদ্য-তালিকা দেখে বুঝলাম ভুল করিনি। টাসকানির বিখ্যাত কিয়ানিনা বীফের স্টেক ওর্ডার করলাম। বিশেষ ধরনের গরুর মাংস দিয়ে তৈরী এই স্টেক। দু’রকম পদ নিয়ে আসলেন আমাদের পরিবেশিকাঃ একটা মাংস হলো এমন গরুর যাকে খুব আদরযত্নে বড় করা হয়েছে; অন্যটি হলো, যাকে দিয়ে হালচাষ করানো হয়েছে। দুই গরুর মাংসের স্বাদ আলাদা। প্রথমটাতে চর্বির পরিমাণ বেশী, আর পরেরটায় কম। তবে, দুটোই দারুণ সুস্বাদু। এখানেও গরুর মাংসকে এজিং করা হয়। ওল্ড ইজ গোল্ড-এর আরেক প্রমাণ!

বিল পরিশোধ করে যখন বেড়িয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ শেফ বেরিয়ে এলেন। চেহারা দেখে কেমন যেন সন্দেহ হলো। ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম দেশ কোথায়। খানিকটা ইতস্ততঃ করেই বললেন, বাংলাদেশ! যখন বললাম আমরাও বাংলাদেশী, শেফ মহাশয় তো আহ্লাদে আটখানা। তা’র সহকারী বেড়িয়ে এলেন, উনিও একই দেশের। খুব ভালো লাগলো যে, এত মজার যে ফ্লোরেন্টাইন খাবার খেলাম। তা’ বানিয়েছেন আমাদেরই দুই বাংলাদেশী।

এত আমিষের পর একটু মিষ্টিমুখ না করলেই নয়। ভেনকি (Venchi) বলে একটি জনপ্রিয় চকোলেট আর আইস্ক্রীমের দোকান আছে কাছেই। এর বিশেষত্ব হলো, এখানে রয়েছে একটা গলা চকোলেটের ঝরণা। না দেখলে ব্যাপারটা বোঝানো মুস্কিল। অনবরত চকোলেট ঝড়ছে এ ঝরণা থেকে। কয়েক মিনিট তাকিয়ে থাকলে ডায়েবিটিস হয়ে যাবে নির্ঘাত! এখানকার হট-চকোলেটও নামের যথার্থতা রক্ষা করে। এ শুধু গরম জলে পাউডার গোলানো পানীয় না, এ হলো সত্যিকারের গলানো চকোলেট।

ভেনকির চকোলেট আইস্ক্রীম আর হট-চকোলেট খেয়ে নিজেকে ধন্য করে ভেনিস ফেরার জন্য গাড়ীতে চড়লাম। প্রায় চার ঘন্টার পথ। পথে যদি ভাল পিৎজেরিয়া পাওয়া যায়, একবার পিৎজা-পূজো করতেই হবে সান্ধ্যভোজনের উছিলায়! (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।