ঘুরে আসুন বাংলাদেশের গ্রিনসিটি থেকে

Rokeya 1

রংপুর হামার রঙ্গে ভরারে, 
আরে ওকি বন্ধু আইসেন হামার বাড়ি। 
আয়ুস ধানের ভাত খোয়ামো, 
থাইকেন জনম ভরি, বিদেশি বন্ধুরে….’

নূরুন্নবী বাদশা,  রংপুর প্রতিনিধি:ঘোরাঘুরির মৌসুমে ঘুরা ঘুরি করতে করতে যদি রংপুর চলে আসতে চান তবে আপনার জন্যই বলে রাখি রংপুর এর নিক নেম-ই হলো গ্রিনসিটি। তাই প্রায় সবজায়গাতেই কিছু না কিছু ন্যাচারাল বিউটি খুজে পাবেন সেই সাথে পাবেন সমৃদ্ধ অতীত এর খোঁজ। 

শুরু করতে পারেন রংপুর শহর থেকেই, পাবেন শত বছরের পুরনো টাউন হল ও জেলা পরিষদ, যা একটি পুরানো প্রাসাদ এবং বর্তমানে পাখির অভয়ারণ্য। শেষ বিকালে পাখি দেখতে আর তাদের কিচির মিছির শুনতে ঘুরে আসতে পারেন সেখান থেকে। তারপর দেওয়ান বাড়ি নামের আরেকটা রাজবাড়ি পাবেন একদম শহরের মাঝেই। শহরের ২ কি.মি এর মাঝেই আছে চিকলির বিল। আছে কুকরুল বিল। আছে শত বছরের পুরানো কারমাইকেল কলেজ এর ক্যাম্পাস। প্রাসাদময় বিশাল ক্যাম্পাস ঘুরতে ঘুরতে যেখানে দেখতে পাবেন কাইজেলিয়া গাছ। যে গাছ পুরো এশিয়াতে আছে মাত্র ৫টা তার মাঝে কারমাইকেলে আছে ২টা।

শহর থেকে কিছু দুরে মিঠাপুকুরের পায়রবন্দ নামক স্থানে বেগম রোকেয়ার বাড়ি। সেই সাথে তার স্মৃতি কমপ্লেক্স ঘুরে দেখে শহর এর সাথেই গড়ে উঠা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্যাম্পাসে কাটাতে পারেন শেষ বিকাল। সেখানেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন।

যেতে পারেন শহর থেকে ৩.৫ কি.মি দুরে ঘাঘট নদীর তীরে। যেখানে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের শেষ সীমানায় গড়ে ওঠা নতুন বিনোদন স্থান ‘প্রয়াস’ গড়ে উঠেছে। যেখানে আছে সেই বিখ্যাত স্থান যেখানে পৃথিবীর বিরল এক ঘটনা ঘটেছিলো। তীর-ধনুক নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট আক্রমনের বীরত্ত পুর্ণ স্থান আছে সেখানে, আছে হাজার শহীদের স্মৃতিসৌধ। 

ঐ রাস্তা ধরে আগালেই একটু কাছেই খুজে পাবেন বিখ্যাত শতরঞ্জি পল্লী। শহর এর জিরো পয়েন্ট এর কাছেই আছে হযরত মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী এর মাজার ও কেরামতিয়া মসজিদ। যিনি ছিলেন হযরত শাহজালাল এর সমকক্ষের একজন ধর্ম প্রচারক।

শহর এর মাঝেই আছে রংপুর চিড়িয়াখানা ঘুরে আসতে পারেন সেখান থেকেও। সময় থাকলে ট্রেনে করে ১৫ মিনিটেই চলে যেতে পারেন শ্যামপুর। বিখ্যাত শ্যামপুর সুগার মিল দেখার সাথে সাথে নারিন্দের দিঘি। জমিদার খিতিশ বাবুর বাড়িসহ , শ্যামপুর থেকে ৩ কি.মি দক্ষিনে গোপালপুর শাল ফরেস্ট দেখে আসতে পারেন। শাল গাছের বনে হারিয়ে যাওয়া, বনের মাঝের মেঠো পথ ধরে হেটে যাওয়ার অনুভূতি কি তা না গেলে বুঝবেন না। 

আম এর সিজনে রংপুর আসলে খেতে পারবেন, বর্তমান বাংলাদেশের সব থেকে বিখ্যাত, দামি ও কদর ওয়ালা হাড়িভাংগা আম। যার সুনামের ধারের কাছেও রাজশাহীর আম নেই।

শেষ বিকালে শহর ছেড়ে ২৪ কি.মি দুরে তিস্তা নদীতে চলে যেতে পারেন সুর্যাস্ত দেখতে। শত শত বছরের পুরনো রেল ব্রীজে বসে নদীতে সুর্যাস্ত দেখতে পারেন তারপর সন্ধ্যার আলোতে পাশের তিস্তা সড়ক সেতুর আলোতে ছবি তুলে ফিরতে পারেন শহরে কিংবা যেতে পারেন তাজহাট জমিদার বাড়ি। যা বাংলাদেশের এককালের সুপ্রিম কোটের ব্রাঞ্চ ছিল যা এখন রংপুর জাদুঘর। বিখ্যাত এই রাজবাড়ির সাথে মিল পাওয়া যায় ঢাকার আহসান মঞ্জিলের। তাজহাট জমিদার বাড়ি আহসান মঞ্জিল থেকেও এক ধাপ এগিয়ে কারণ এর সিড়িগুলো পুরোটাই মার্বেল পাথরের তৈরী। 

থিম পার্কের মজা নিতে চলে যেতে পারেন শহর ছেড়ে ১৫ কি.মি দুরের ভিন্নজগতে যার সৌন্দর্য্য এবং বিনোদন ব্যবস্থা আপনাকে মুগ্ধ করবে। এই ভিন্নজগতেই আছে বাংলাদেশের ১ম প্লানেটরিয়াম। এটার পরেই দ্বিতীয় প্লানেটরিয়াম হলো ঢাকার ভাসানি প্লানেটরিয়াম। 

যেতে পারেন রংপুর শহর এর ফায়ার সার্ভিস এর অফিসে যার পিছনেই আছে, বিখ্যাত রানী দেবি চৌধুরানীর বাসা। কিংবা যেতে পারেন শহর ছেড়ে কিছু দুরে সদ্যপুস্করনী ইউনিয়নে। যেখানে আছে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজির ভারত বর্ষ জয় এর সময় তাবু ফেলার স্থান। যেখানে তিনি তার লাখো সৈনিক দিয়ে এক রাতেই খুড়ে ছিলেন বিশাল এক দিঘি যা সদ্যপুস্করনি নামে পরিচিত। 

শহরের মাঝেই সেন পাড়াতে পাবেন স্কাইভিউ নামের বাসা যা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ এর বাবার বাড়ি। কিংবা দর্শনার পল্লীনিবাস দেখতে পারেন যা এরশাদ এর নিজের বাড়ি। 

রংপুর সার্কিট হাউজও ঘুরে আসতে পারেন। বাংলাদেশের এক ব্যতিক্রম ঘটনার সাক্ষী এই স্থানটি। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া একই সাথে একই দিনে একসাথে এই সার্কিট হাউজে ছিলো। খালেদা জিয়া দোতলাতে আর শেখ হাসিনা নীচতলাতে। তা ছাড়াও বাংলাদেশের ইতিহাস এ ১ম মন্ত্রী সভার বৈঠক ঢাকার বাহিরে ১ম এই রংপুর সার্কিট হাউজেই হয়েছিল। 

ঘুরে আসতে পারেন শহর এর ভিতরের জমিদার বাড়ি বাকালি হাউজ থেকে যে বাড়ির পুত্রবধু প্রয়াত নজরুল সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগম।

যদি চান নদীর চরে রাত কাটাতে তবে শীতকালে চলে যেতে পারেন শহর থেকে ১২ কি.মি উত্তরে মহিপুরে। বাংলাদেশের বিখ্যাত বিড়ি, সিগারেট ও তামাক জাত শিল্পনগরী দেখতে যেতে পারেন হারাগাছ। 

এ সকল স্থান ছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন, মিঠাপুকুরের তারকা মসজিদ,  অনেক মোঘল আমলের মসজিদ মন্দির, পীরগঞ্জের আনন্দ নগর, বদরগঞ্জের মায়া ভুবন, পীরগঞ্জের রাবার বাগান সহ আরও অনেক কিছুই।

রংপুর আসবেন কিভাবে আর থাকবেন কোথায় : রংপুরে বাস, ট্রেন, প্লেন যে কোন ভাবেই আসতে পারেন। আগমনী, শ্যামলী, হানিফ, এস আর,  টা আর, নাবিল সহ নানা পরিবহনের এসি, নন এসি বাস দিন-রাত ২৪ ঘন্টাই ছাড়ে ঢাকা, সিলেট, চিটাগং, খুলনা থেকে। আসতে পারেন ট্রেনেও রংপুর এক্সপ্রেস ৯ টায় ছাড়ে কমলাপুর থেকে। কিংবা ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ, বিমান বাংলাদেশ ও ইউএস বাংলা এয়ারওয়েজ এ সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট হয়ে আসতে পারেন রংপুরে। রংপুরে থাকার জন্য আছে ফোর স্টার হোটেল নর্থ ভিউ, পর্যটন মোটেল, আরডিআরএস মোটেল, বিজয় হোটেল, হোটেল গোল্ডেন টাওয়ারসহ আর অনেক। 

সারা শহরে খুজে পাবেন সুস্বাদু সব খাবারের রেস্তরা, ফাস্ট-ফুড, চাইনিজ ও থাই রেস্টুরেন্ট। শহরের চার পাশে ঘোরার জন্য পাবেন, রিক্সা, অটো রিক্সা, বাস, রেন্টে কার। তবে আর দেরি কেন? ঘুরে আসুন বাহে হামার রংপুর থেকে।