নৈসর্গের এক অপূর্ব জলপ্রপাত নাফাখুম

nafakhum-bandarban-01

 মাহবুবুর রহমান (সাভার প্রতিনিধি, ঢাকা) এ অঞ্চলটি বান্দরবন জেলার থানচি উপজেলার একটি মারমা অধ্যুসিত এলাকা। মারমা ভাষায় খুম শব্দের অর্থ হচ্ছে ঝর্না বা জলপ্রপাত বা জলপতন। রেমাক্রি খালের পানি প্রবাহ পাথুরে পথে নামতে গিয়ে চমৎকার এই জলপ্রপাতের সৃটি করেছে। এই খানে নাফা নামের এক প্রকার মাছ পাওয়া যায়, এরা স্রোতের বিপরীতে লাফ দিয়ে ঝর্না পার হতে চেষ্টা করে, আর এখানে স্থানীয় উপজাতীয়রা সহজেই সে মাছগুলোকে জাল দিয়ে ধরে। সম্ভবত সে কারনেই এই ঝর্নার নাম নাফাখুম।

সবুজ পাহাড়ী বন আর পাথুরে ভুমির মাঝে নাফাখুম এই অঞ্চলটি অসাধারন স্বপ্নময় সুন্দর স্থান। আমাদের দেশেই এত সুন্দর জায়গা আছে তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না।

নাফাখুম যাওয়ার রোমাঞ্চকর পথ

প্রথমেই আপনাকে পৌছতে হবে বান্দরবন। ঢাকা থেকে রাত ১১:৩০ টায় বিভিন্ন সার্ভিসের বাস বান্দরবনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং সকাল ৭:৩০ এর মধ্যে পৌছে যায়। নাফাখুম ভ্রমনের পথ হবেঃ বান্দবন – থানচি – তিন্দু – রেমাক্রী – নাফাখুম।

১. বান্দরবন থেকে থানচি

থানচি বান্দরবনের সর্বদক্ষিণের উপজেলা। শঙ্খ (স্থানীয় ভাষায় সাঙ্গু) নদীর তীরে অবস্থিত এটি। বান্দরবান শহর থেকে এর দূরত্ব ৮২ কিঃমিঃ। রিজার্ভ চাঁদের গাড়ীতে বান্দরবান থেকে থানচি যেতে সময় লাগবে প্রায় ৪ ঘন্টা, পর্যটন মৌসুমে ভাড়া নেবে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা । পথে চিম্বুক আর নীলগিরিতে নেমে কিছু ছবি তোলার ইচ্ছে থাকলে সময় কিছুটা বেশী লেগে যেতে পারে। বাসেও যেতে পারেন, ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ১৯০ টাকা । পাবলিক বাস বলিপাড়ায় কিছুক্ষন যাত্রা বিরতি দিয়ে থেকে। মোট সময় লাগবে প্রায় ৫ ঘন্টা। বাস ছাড়ার সময় – বান্দরবন থেকে সকাল ৮টা, ১০.৩০টা, ১২.৩০ এবং ২.৩০ এবং থানচি থেকে সকাল ৮টা, ১০টা, ১২টা, ২টা।

২. থানচি হতে রেমাক্রী

এখানে থেকে নৌপথে আপনাকে পৌছতে হবে রেমাক্রী। থানচি ঘাটে নৌকাচালক সমিতি হতে নৌকা ভাড়া নিতে হবে এবং সাথে অবশ্যই নিতে হবে গাইড সমিতির তালিকাভুক্ত একজন গাইড। গাইড সমিতির সেবা মূল্য ১০০ টাকা এবং থানচি হতে রেমাক্রী পর্যন্ত গাইডকে দিতে হবে ৫০০ টাকা প্রতিদিন।

থানচিতে বিজিবি চেক পোস্ট রয়েছে, অত্র পাহাড়ি অঞ্চলে ভ্রমনের আগে এখানে আপনাকে অনুমতি নিতে হবে। সাদা কাগজে সব টুরিষ্টদের নাম, ঠিকানা, পিতার নাম, ফোন নাম্বার, মাঝির নাম, গাইডের নাম ও জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি ইত্যাদি জমা দিয়ে নাফাখুম যাবার অনুমতি নিতে হবে। থানচি বাজারে দুপুরের খাওয়া ও প্রয়োজনীয় কিছু কেনার থাকলে শেষ করে স্রষ্টার নামে নৌকায় উঠে পড়ুন।

বর্ষায় ইঞ্জিনবোটে থানচি থেকে তিন্দু যেতে সময় লাগবে আড়াই ঘন্টা। তিন্দু থেকে রেমাক্রি যেতে লাগবে আরও আড়াই ঘন্টা। এই পাঁচ ঘন্টার নৌ-পথে আপনি উজান ঠেলে উপরের দিকে উঠতে থাকবেন। বর্ষা মৌসুমে তিন দিনের জন্য ইঞ্জিনবোটের ভাড়া পড়বে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা।

শীতের সময় ইঞ্জিন বোট চলার মত নদীতে যথেষ্ট গভীরতা থাকেনা। তখন ঠ্যালা নৌকাই একমাত্র বাহন। ঠ্যালা-নৌকার ভাড়া পড়বে প্রতি দিনের জন্য ১০০০ টাকা। শুষ্ক মৌসুমে পানির গভীরতা না থাকায় কয়েকবার নৌকা থেকে নেমে যেতে হয়। থানচি থেকে নৌকায় উঠার সময় এক কাঁদি কলা নৌকায় নিয়ে নিতে পারেন পথে বেশ কাজে লাগবে।

থানচি থেকে বড় সাইজের পলিথিন (পিস ২০-২৫ টাকা) এবং রশি কিনে নেবেন। পলিথিনে আপনাদের ব্যাগগুলা ঢেকে নিবেন যাতে পানি না লাগে। আর রশি লাগবে নাফাখুম যাবার সময়। লাইফ জ্যাকেট নিতে পারেন ৫০ টাকা/দিন।

এখানে প্রকৃতি অভাবনীয় সুন্দর আর নির্মল। নদীর দুপাশে পাথুরে পাহাড়। কোন কোন পাহাড় এতই উচু যে তার চূড়া মেঘে ঢেকে আছে। সবুজে ঘেরা এই পার্বত্য অঞ্চলে মাঝে মাঝে দেখতে পাবেন দু একটি উপজাতি বাড়িঘর।

কখনো নদীগুলোর গভীরতা এতই কম যে পানির নিচে পাথর দেখা যায়। কোথাও বা নদীর মাঝেই উচু হয়ে আছে বিশাল বিশাল পাথর। যেখানে নদী ঢালু হয়ে গেছে সেখানে প্রচন্ড স্রোত। গমগম করে নেমে যাচ্ছে পানির ঢল। এমন জায়গায় নৌকা প্রায় চলতেই পারে না। তাই নেমে হেটে যেতে হয়। যাত্রা পথে এমন ভাবে বেশ কয়েকবার নেমে হেটে যেতে হয়। তিন্দুতে একটি বিজিবি ক্যাম্প আছে। নাফাখুম যাবার পথে থানচি না থেকে তিন্দুতে এসে রাত্রিযাপন করতে পারেন। এখানে থাকার জন্য কিছু ঘর ভাড়া পাওয়া যায়।

তিন্দু হতে একটু সামনে এগিয়ে গেলেই বড় পাথর। স্থানীয়রা একে রাজা পাথরও বলে থাকে এবং তারা বিশ্বাস করে যে এই রাজা পাথরকে সম্মান দেখাতে হয়, নতুবা দুর্ঘটনা ঘটে। এখানেও শীত মৌসুমে নেমে হেটে যেতে হয়। এখানে বিশাল আকারের পাথর সহ ছোট বড় অনেক পাথর নদীর মাঝে পড়ে আছে। ধারনা করা হয় বহু বছর আগে ভুমিকম্পের কারনে পাথুরে পাহাড় হতে এই বিশাল আকারের পাথরের টুকরো গুলো নদীর মাঝ খানে এসে পড়েছে, আর নদের আয়তন কমে এখানে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হয়েছে।

রেমাক্রী বাজারের পৌছার কিছুটা আগে ছোট একটা জলপ্রপাত আছে, নাম রেমাক্রীখুম। প্রায় ৪/৫ ফুট উচু হতে ধাপে ধাপে পানি সাঙ্গু নদীতে পরছে। দুচোখ জুড়িয়ে যাবার মত দৃশ্য। ছবির মত এসব দৃশ্য দেখে আপনার বুকটা গর্বে ভরে যাবে আর মনে হবে এই আমার মাতৃভূমি, আমার বাংলাদেশ। আসলে কষ্টকর এই নদী ভ্রমনটা না থাকলে নাফাখুম দর্শনটা একেবারেই সাধামাটা হয়ে যেত। রেমাক্রী পৌছানোটাই মূল উদ্দেশ্য না, বরং নৌপথের রোমাঞ্চকর এই ভ্রমনটাই জীবনের অসাধারন স্মৃতিময় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

রেমাক্রী বাজারটা খুবই ছোট। বাজারের মাঝখানে বিশাল একটা উঠান আর চারদিকে দোকান। পেছনে থাকার ব্যবস্থা আর সামনে দোকান। আর তার পাশেই আছে একটি বিজিবি ক্যাম্প। রাতে রেমাক্রীতে বাজারে থাকতে পারেন। রেমাক্রি চেয়ারম্যানের একটা রেস্ট হাউজ আছে; এক রুমের ভাড়া ৫০০ টাকা; ১০-১২ জন থাকা যায়। তাছাড়া মারমাদের প্রায় প্রতিটি বাড়ীতেই খুব অল্প টাকায় থাকা-খাওয়ার সুবিধা রয়েছে। তিনবেলা খাওয়ার খরচ পরবে জনপ্রতি ২০০ টাকা; এক্ষেত্রে থাকার জন্যে কোন খরচ দিতে হবে না।

 ৩. রেমাক্রী হতে নাফাখুম

রেমাক্রী হতে নাফাখুম পর্যন্ত আর কোন বাহন আপনি পাবেন না। ওই পথটা আপনাকে হেটে যেতে হবে। এখানে পূর্বের গাইডকে রেখে আবার নতুন গাইড নিতে হবে। পূর্বের গাইড ও নৌকা্র মাঝি আপনার জন্য রেমাক্রিতে অপেক্ষা করবে। নাফাখুমে রওনা হওয়ার পূর্বে আবারও আপনাকে নাম ঠিকানা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্প হতে অনুমতি নিতে হবে।

রেমাক্রী বাজার হতে নদীর কুল ঘেষে প্রায় ২/৩ ঘন্টা হেটে পৌছবেন নাফাখুম। নদীর তীরটা পাথুরে এবং বালুকাময়; এখানে জনবসতি একেবারেই কম, মাঝে মাঝে দু একজন উপজাতীদেরকে মাছ ধরতে দেখা যায়। এই পথে বেশ কয়েক বার বুক সমান গভীর নদী পার হতে হয়।

দীর্ঘ পথ পারী দিয়ে নাফাখুম পৌছবেন, ক্লান্ত পা ঝর্ণার পানিতে ভেজানোর সাথে সাথে সব ক্লান্তি দুর হয়ে যাবে নিমিষেই। আর অসাধারন সব দৃশ্যাবলী দেখে মনে হবে আপনি হলিউডের কোন সিনেমার দৃশ্যে ঢোকে পড়েছেন।

জেনে রাখা ভাল

পার্বত্য অঞ্চলের সব জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নাই। থানচি পর্যন্ত টেলিটকের নেটওয়ার্ক পাবেন। তিন্দুতে বাঁশের এ্যন্টেনা লাগানো সেট থেকে হয়ত যোগাযোগ করতে পারবেন। কিন্তু রেমাক্রি পৌঁছালে আপনি একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন।

কোথায় থাকবেন

 রেমাক্রি আদিবাসী পল্লীতে থাকতে পারেন। তাছাড়া খাওয়া থাকার ব্যাপারে গাইড আপনাকে সাহায্য করবে। থানচিতে থাকার জন্য একটি সরকারী রেষ্টহাউজ আছে। তাছাড়া এখানকার নৌকা ঘাটে কয়েকটি থাকার ঘর আছে। এসব ঘরে থাকার জন্য কোন পয়সা দিতে হয় না। ৩ বেলা খেলে থাকা ফ্রি। পর্যটন মৌসুমে এসব থাকার জায়গাগুলো বুক হয়ে গেলে আপনি স্থানীয় চেয়াম্যান এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তিনি আপনাদের একটা না একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।

এক নজরে – সহজ প্ল্যানিং

 রাতে ঢাকা থেকে রওনা হলে সকালে পৌছবেন বান্দরবন। যদি প্রাইভেট জীপে (চান্দের গাড়ী) বান্দরবন থেকে থানচি যান এবং ইঞ্জিন বোটে থানচি থেকে রেমাক্রি যান তাহলে ৩ দিনে নাফাখুম ঘুরে আসতে পারবেন।

দিন – ১ (বান্দরবান থেকে রেমাক্রি)

সকাল ৭.০০ টায় বান্দরবান থেকে রওনা হলে থানচি বাজার পৌছবেন দুপুর ১১ টায়। থানচি বাজার থেকে রেমাক্রি বাজার ইঞ্জিন নৌকায় সময় লাগবে ৫ ঘন্টা, দুপুর ১২.৩০ টার মধ্যে নৌকা ছাড়তে পারলে সন্ধ্যার মধ্যে রেমাক্রি পৌছতে পারবেন।

দিন – ২ (রেমাক্রি থেকে নাফাখুম)

নাফাখুম যেতে আলাদা গাইড নিতে হবে। পাহাড়ী খালের পথে হেটে যেতে মোট সময় লাগবে = যাওয়া ২.৩০ ঘন্টা + আসা ২.৩০ ঘন্টা + থাকা ২ ঘন্টা = মোট ৭ ঘন্টা।

দিন – ৩ (নাফাখুম থেকে বান্দরবন)

রেমাক্রি থেকে থানচি তারপর বাসে বান্দরবন, রাতের বাসে ঢাকা চলে আসতে পাড়েন অথবা আরো একদিন সময় থাকলে বান্দরবনের আশে পাশে ঘুরে দেখতে পাড়েন।

খরচ

৬ জনের একটা গ্রুপ বান্দরবন থেকে নাফাখুম ঘুরে আসতে সম্ভাব্য খরচ।

থানচি পর্যন্ত চান্দের গাড়ি এবং রেমাক্রি পর্যন্ত ইঞ্জিন বোট, ৩ দিন ভ্রমনের সম্ভাব্য খরচ ৩০০০ টাকা

বান্দরবন থেকে থানচি জীপ ভাড়া = ৪০০০ টাকা

থানচি থেকে রেমাক্রি ইঞ্জিন বোট = ৫০০০ টাকা

গাইড প্রতিদিন ৫০০ করে ৩ দিন = ১৫০০ টাকা

গাইড রেমাক্রি থেকে নাফাখুম ১ দিন = ৫০০ টাকা

থাকা খাওয়া প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে ৬ জন ৩ দিন = ৩০০*৬*৩= ৫৪০০ টাকা

থানচি থেকে নামদরবন ফিরে আসতে বাস ভাড়া = ২০০*৬ = ১২০০ টাকা

মোট = ১৭৬০০ টাকা

জন প্রতি = ১৭৬০০/৬ = ২৯৩৩ টাকা।

থানচি পর্যন্ত পাবলিক বাস এবং বাকী পথ নৌকা, ৪ দিনের ভ্রমনে সম্ভাব্য খরচ ২৫০০ টাকা

বান্দরবন থেকে থানচি বাস ভাড়া = ২০০*৬ = ১২০০ টাকা

থানচি থেকে রেমাক্রি নৌকা ৪ দিন = ১০০০*৪ = ৪০০০ টাকা

গাইড প্রতিদিন ৫০০ করে ৪ দিন = ২০০০ টাকা

গাইড রেমাক্রি থেকে নাফাখুম ১ দিন = ৫০০ টাকা

থাকা খাওয়া প্রতিদিন ৩০০ টাকা করে ৬ জন ৩ দিন = ৩০০*৬*৩= ৫৪০০ টাকা

থানচি থেকে বান্দরবন ফিরে আসতে বাস ভাড়া = ২০০*৬ = ১২০০ টাকা

মোট = ১৪৩০০ টাকা

জন প্রতি = ১৪৩০০/৬ = ২৩৮৩ টাকা।

যে সকল জিনিসপত্র সাথে নিবেন

মশা প্রতিরোধক ক্রীম, কয়েক জোড়া মোজা, প্যারাসিটেমল জাতিয় ঔষধ, এন্টিসেপ্টিক ক্রীম, খাবার স্যালাইন, কলম, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, ম্যাচ, শুকনো খাবার ও পানি।