দুবাই-যাত্রীর ডায়েরী

Dubai

সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটারের আকাশপথ পাড়ি দিয়ে বিখ্যাত DXB বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। এমিরাত বিমানের আতিথিয়তায় সিক্ত হয়ে তা’দেরই ব্যবস্থা করা বিলাশবহুল গাড়ীতে চেপে হোটেলে এসে পৌঁছে চোখ কপালে ঊঠলো! সবুজের ছড়াছড়ি, রঙবেরঙের ফুলের কার্পেট আর বিশাল জলাশয় দেখে বোঝা দায় হয়ে উঠছিল যে এটা মরুর দেশ। হোটেলটি একটি উপসাগরের তীরে।

কয়েকশ’ একর নিয়ে এর ব্যাপ্তি। এখানে সবকিছুই বিশাল পরিসরের। শপিং-মলই বলুন অথবা অফিস বিল্ডিংই বলুন, সব মাইল খানেক লম্বা! কোনটা চওড়ায়, আর কোনটা বা উচ্চতায়! এদের নির্মানকাজের যেন কোন বিরতি নেই। কিছু না কিছু সবসময় এরা তৈরীতে ব্যস্ত। হয় উড়ন্ত সেতু, না হয় আকাশ্চুম্বী বিল্ডিং, অথবা স্থাপত্যশৈলীর জাঁক দেখিয়ে কোন হোটেল। মাঝে মাঝে তো আর কিছু না পেয়ে কয়েক মাইল লম্বা খালও বানিয়ে ফেলে এরা। শহরের মাঝামাঝি একটা ৫০০ ফুট উঁচু চারকোনা ফ্রেম তৈরী করেছে কিছুদিন আগে, পুরোনো আর নতুন শহরকে দু’পাশে রেখে। মরুভূমিতে তো প্রচুর ধুলোবালি থাকার কথা। কিন্তু এদের রাস্তাঘাট এত পরিস্কার কি করে রাখে আল্লাহমালুম! বোধহয় সব ধুলো ঝেঁটিয়ে আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।


ঘন্টা দু’য়েক হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে সান্ধ্যভোজনের উদ্দেশ্যে বেরুলাম। পৃথিবী বিখ্যাত ‘নুস,র-আত’ আমাদের গন্তব্য। এর বিশেষত্ব হলো ‘সল্ট বে’ খ্যাত এক তুর্কী বাবুর্চী, যে এক চিমটে নুন ডান হাতের আঙ্গুলে নিয়ে হাতটাকে সাপের ফণার মত করে বাঁকিয়ে কনুইয়ের ওপর নুনগুলো ফেলে খাবারের ওপর ছিটিয়ে দেয়। এই ইন্টারনেট আর ইউটিউবের জামানায় ওর এই অদ্ভুত ভঙ্গিমা ওকে তারকা বানিয়ে দিয়েছে। হলিঊড-বলিউডের নামীদামী তারকা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রনায়কেরা পর্যন্ত ওর নুন ছিটানো আর ওর বানানো মাংসের স্টেক খেতে ভীড় করে ওর এই রেস্তঁরায়। ওর নিজের দেশ আর দুবাই ছাড়াও এ রেস্তঁরার শাখা এখন রয়েছে লণ্ডন আর নিউ ইয়র্কে।

মেন্যু দেখেই জীভে জল এসে গেল! বেয়ারাকে বললাম, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়ে এসো জনপ্রিয় পদগুলো। কাঁচা মাংসের সুশি, মাংসের তৈরী স্প্যাগেটি, স্টেক, এবং সবশেষে টেবিলে রান্না করা চর্বি আর মাখনে ডোবানো পাতলা স্টেক, যার সাথে রুটি ছিড়ে ছিড়ে মাখনে ভিজিয়ে খেতে হয়। সব মিলিয়ে যা খেলাম, তা’তে নির্ঘাত হৃদপিণ্ডের দু’-তিনটে আর্টারি বন্ধ হয়ে গেছে! এখানে গরুর মাংসকে রীতিমত পূজো করে বাবুর্চী থেকে বেয়ারা! আমরা তো তাজা মাংস দিয়ে রান্না পছন্দ করি, কিন্তু এখানে মাংসকে একটা বিশেষ তাপমাত্রায় রেখে পুরনো করা হয়। প্রক্রিয়াটাকে বলে এজিং। আমার জানামতে আমাদের দেশে একমাত্র ধাণমণ্ডির ‘পিট গ্রীল’-এই এ এজিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এই এজিং-এর ফলে মাংসের স্বাদ বেড়ে যায়। ছোটবেলায় দেখেছি, কোরবানী ঈদের গোশত শুকিয়ে মহররমের সময় তা’ রান্না করে খাওয়া হত। এটা বোধহয় আমাদের নিজেদের দেশীয় এজিং প্রক্রিয়া!

কোলেস্টরেল-পূজো শেষে দুবাই দেখতে বেরুলাম। যতই দেখি, ততই বছর পাঁচেক আগে দেখা দুবাইয়ের সাথে মিল খুঁজে পাইনা। আগেই বলেছি, সারাক্ষণ নির্মাণকাজ চলছে এখানে, আর খুব দ্রুত চলে এই কাজগুলো। যেখানে আগে মরুভূমি দেখেছি, সেখানেই এখন দেখি আকাশচুম্বী বিশাল দালান। যেখানে ছিল ধুসর বালি আর বালি, সেখানে এখন ঘন সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়া গলফকোর্স।‌ রাস্তার দু’পাশে রঙীন ফুলের শোভা। এই আমিরাতি আরবগুলো মাথা-মোটা সৌদীগুলোর মত পাশ্চাত্যের মন্ত্রণায় ভুলে শুধু অস্ত্র-ভাণ্ডার বোঝাই করেনি, এরা দেশটাকে বাণিজ্যের স্বর্গভূমি বানিয়ে এবং ইদানীংকালে তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে অর্থনীতিকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে। তাই পৃথিবীর চতুষ্কোণ থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে এ শহরে।

দুবাই-দর্শন শেষে হোটেল ফেরা। কাল সাত সকালে এমিরেটস-এর গাড়ী নিতে আসবে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নেক্সট স্টপ ভেনিস।

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।