ব্রাজিল যাত্রীর ডায়েরী –পর্ব ৩

Brazil 3

সৈয়দ আলমাস কবীর: রিও-তে এসে কোপাকাবানা সৈকতের ওপর থেকে সমুদ্রস্নান করবো না, তা’ কি হয়! সকালে উঠে হোটেলের বিস্তৃত প্রাতঃরাশ সেরে চলে এলাম বীচে। একটু পর পর বেড়া দিয়ে ছাপড়া তৈরী করে নানান পানীয় বিক্রী করছে স্থানীয়রা, আর বীচে বসার চেয়ার আর বড় ছাতা ভাড়া দিচ্ছে। এটা অবশ্য অনেক সমুদ্র-সৈকতেই দেখা যায়, কিন্তু এটা রিও বলে কথা, ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট সার্ভিসও পাওয়া যাচ্ছে এখানে। দু’টো চেয়ার ও একটা ছাতা নিয়ে বসে পরলাম আমরা। আস্তে আস্তে লোকজন জমতে শুরু করলো সৈকতে।

কিছুক্ষণ সৈকতের ধারে হেঁটে, ছবি তুলে সাহস করলাম একটু পা ভেজাতে। সমুদ্রে এই গা ভেজানোটা নবোঢ়ার লাজুক ভাবের মতন; ঢেউ এসে একটু পায়ের পাতা ছুঁয়ে যায়, আমিও একটু সরে আসি; আবার ঢেউ এসে এবার গোড়ালি ছোঁয়। তারপর আমিও একটু সাহস করে এগোই, সমুদ্রও সেই সুযোগে আমার হাঁটু পর্যন্ত ভিজিয়ে ফেলে। একটা সময় হঠাৎ করেই বড় একটা ঢেউ এসে পুরো গা ভিজিয়ে দিয়ে পালিয়ে যায়! তারপর আর কোন বাঁধ নেই।

কোপাকাবানা বীচে ‘কাইপিরিহ্না’ খুব জনপ্রিয়। সমুদ্রস্নান করতে করতে আর রোদ পোহাতে পোহাতে এরা এই লেবু, নুন আর বিশেষ ব্রাজিলীয় স্পিরিট মিশ্রীত পানীয় কাইপিরিহ্না খেতে খুব পছন্দ করে। রিও-র প্রধান আকর্ষণ এই সৈকত, তাই নানাবিধ বিপনন কার্যক্রমও এখানে চোখে পড়ে। ছোট বিমানের পেছনে লম্বা ব্যানার বেঁধে এই সমুদ্র-সৈকতের ওপর দিয়ে কিছুক্ষণ পর পর ঘুরতে থাকে। ব্যানারে লেখা কোন পণ্য বা সেবার কথা এতগুলো মানুষকে একসাথে দেখানোর এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর। কোপাকাবানা বীচটি মোটামুটি পরিষ্কারই বলা চলে। লোকজন ময়লা ফেলে না, আর যা ফেলে তা’ খুব তাড়াতাড়িই পরিষ্কার করে ফেলে এরা। সাদা বালুর এই সৈকতে অনেকে ফুটবল আরা ভলিবল খেলে। গোলপোস্ট আর নেট বানানোই থাকে, বল নিয়ে নেমে পড়লেই হলো। কোপাকাবানর আরেকটা বিশেষত্ব হলো এর বীচের ধার দিয়ে চার কিলোমিটারের চওড়া ফুটপাত, যাতে কিনা সাদা আর কালো পাথরের ছোট ছোট ব্লক একটা বিশেষ ডিজাইনে বসানো। এই নকশাটা বেশ ইউনিক, যা কিনা দেখলে কোপাকাবানর কথা মনে করিয়ে দেবে।

আমাদের যা স্বভাব, বসতে পেলে শুতে মন চায়! সমুদ্রে গা ভেজানো তো হলো, এবার তো একটু সমুদ্রে যেতে ইচ্ছে করছে। ট্যাক্সি ভাড়া করে একটা বোট-ক্লাবে এসে উপস্থিত হলাম। এক সাড়েংকে পেয়ে তাকে প্রস্তাব দিলাম যে আমাদেরকে তা’র বোটে চড়িয়ে ঘন্টা খানেক সমুদ্রভ্রমণ করিয়ে আনবে। টাকা একটু বেশীই দেব বলে রাজী হয়ে গেল সে। এখানে বলে রাখি, ব্রাজিলে এসে দোকানপাটে, রাস্তাঘাটে যখনই ইয়েস-নো-ভেরীগুডের বেশী কথা বলতে হয়েছে, তখনই আমার মোবাইল ফোনের অনুবাদ অ্যাপটা ব্যবহার করতে হয়েছে। মাইক্রোসফট কোম্পানীর বানানো এই অ্যাপটা এই ধরণের ইংরেজী না-জানা দেশভ্রমণে অপরিহার্য।

প্রায় বিশ ফিট দৈর্ঘ্যের বোটের ওপর শুয়ে আছি যা অতলান্তিকের ওপর ঘন্টায় আনুমানিক ৫০ কিলোমিটার বেগে ছুঁটে চলেছে। চারপাশে অথৈ জলরাশি। খুব পরিষ্কার না যদিও এই পানি। শহরের ময়লা অনেক দূর এসে কালো আর ঘোলা করে ফেলেছে এই পানিকে। সুগারলোফ পর্বত, করকোভাদো পাহাড়, টিযুকা জঙ্গল, বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বানানো জেলখানা এবং অবশেষে কোপাকাবানা ঘুরে আবার ফিরলাম বোট-ক্লাবে। সকালে গা ভিজিয়ে আর পরে সমুদ্রভমণ করে অতলান্তিক মহাসাগরের সাথে আজ একটা আত্মীয়তা করলাম।

মারকো’স রেস্তোঁরার সাজসজ্জা বেশ মজার। প্লেট-বাসন থেকে শুরু করে টেবিল-ল্যাম্প, হাতব্যাগ, গাড়ীর ইঞ্জিন, তলোয়ার, ঘড়ি যা পেয়েছে, সব সেঁটে দিয়েছে আঠা দিয়ে চার দেওয়ালে আর ছাঁদে। ঢুকতেই একটা মধ্যযুগীয় শুলের চেয়ারও রয়েছে! সজ্জা যতই বিকট হোক না কেন, খাবার এবং এদের সেবা কিন্তু প্রথম শ্রেণীর। সামুদ্রিক মাছ, শামুক, ঝিনুক, ইত্যাদির একটা বিশাল টেবিল রয়েছে। এঁর সাথে আছে ব্রাজিলীয় নানান রান্না। হাজার ধরণের আচার আর সস্‌ও রয়েছে পছন্দ মত যোগ করে নেওয়ার জন্য। এরপর টেবিলে টেবিলে নিয়ে আসবে ব্রাজীলীয় চুরাস্কিয়া কাবাব। সবকিছুই খাওয়া যাবে পেট-চুক্তিতে। বেশ আয়েশ করে ঘন্টা দু’য়েক ধরে খেলাম নানান সীফুড আর মাংসের বারবিকিউ। খুব বুদ্ধি করে কয়েকটা টেবিল করেছে এরা, যেখানে টেবিলের ভেতরই বসানো আছে নানা ধরণের মরিচের আর মশলার গাছ। খেতে খেতে গাছ থেকে পেড়ে খাবারের সাথে যোগ করে নিতে পারেন সেগুলো। ভুঁড়িভোজ সেরে, তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বেরোলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। কাল সকাল সকাল উঠে যাব করকোভাদো পাহাড়ে। পাহাড়ে ওঠার ট্রেণের টিকেট কাটা আছে।

 কোপাকাবানার ধার দিয়ে হেঁটে, মাঝে মাঝে রাস্তা সংলগ্ন পানাশালাগুলোতে নাচতে থাকা অতিথিদের সাথে একটু পা দুলিয়ে ফিরলাম হোটেলে। হোটেলের টিভি-র একমাত্র ইংরেজী চ্যানেল সিএনএন-এ আমাদের উপমহাদেশের দুই দেশের মধ্যেকার রেশারেশির কথা শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানিনা। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।