রংপুর প্রায়াস সেনা বিনোদন পার্ক

6

রংপুর প্রতিনিধি : নূরুন্নবী বাদশা: দিনশেষে পশ্চিম আকাশে ডুবে যাওয়া সূর্যের রক্তিম আভায় সাঁঝ বেলায় নদীর তীরে বসে গায়ে শীতল হাওয়া লাগাতে ভালবাসে প্রতিটি মানুষ। কিন্তু সেই সময়-সুযোগ হয়ে উঠে না সহজে। এজন্য চাই একটু অবসর এবং নদী আর নির্মল পরিবেশ। আর সেই সুযোগই আপনাকে করে দিচ্ছে রংপুরের প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক। নদীর পাড়ের নির্মল পরিবেশে বিনোদনের এক অপূর্ব নিদর্শন এই পার্ক। রংপুর ভ্রমণে গেলে ঘাঘট নদীর পাড়ে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ কিছুটা নিরিবিলি সময় কাটাতে ঘুরে আসতে পারেন নান্দনিক সৌন্দর্যের এই পার্ক থেকে।

রংপুর শহরের অদূরে নিসবেতগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত রক্ত গৌরব চত্বরে ঘাঘট নদীর দুপাশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছে মনোরম এই পার্কটি। প্রায় ১১০০ একর জায়গা নিয়ে ২০১৩ সালে ঘাঘট নদীর দুপাড় ও এর আশেপাশের এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে এই পার্ক। পার্কটির সৌন্দর্যময় নীরব পরিবেশ  মনকে ডেকে নিয়ে যায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে। নির্জনতা প্রিয় যারা তাদের জন্য অসাধারণ স্থান এটি। নির্জনতার মাঝে হঠাৎ নিমের ডালে এক ঝাঁক কাকের এলোমেলো ডাক আপনাকে চমকে দেবে। ঠিক যেন নৈঃশব্দতার ঘুম ভাঙানো।

পার্কের মূল ফটকে যেতেই চোখে পড়বে ডাইনোসরের প্রতিকৃতি। সেনাসদস্যদের নিখুঁত কারিগরি পরিকল্পনায় বাঁশ ব্যবহার করে সাজানো এ বিনোদন পার্কের মূল গেট পেরিয়ে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন স্পট দেখতে পাবেন।পার্কের ভেতরের মূল সড়ক সাজানো হয়েছে লোহার গ্রিল দিয়ে, যার ওপরে লতাগুল্ম বেয়ে উঠে তার সৌন্দর্যে যোগ করেছে অনন্য মাত্রা। এখানে ঘাঘট নদীকে দুভাগ করা সুউচ্চ ও সুবিশাল রাস্তা ধরে হেঁটে যেতে চমৎকার লাগে। হাঁটতে হাঁটতে নদীর দুধারে দেখতে পাবেন  প্রাচীন নৌকার সারি, খানিক দূরে কাশবন। অপূর্ব সেইসব দৃশ্যাবলী।

পার্কে কৃত্রিম সমুদ্রসৈকত, নৌকাভ্রমণসহ সব বিনোদন ব্যবস্থার সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। সুন্দর সব বসার জায়গা পার্কের পরতে পরতে। মুখোমুখি বসবার জন্য দারুণ ব্যবস্থা থাকায় কপোত-কপোতীদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায় এখানে। চমৎকার একটি স্পট এটি।

রাস্তার সঙ্গেই  তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব টং দোকান। কি সুন্দর পরিপাটি ফুসকা-কফি সপের দোকানগুলো ! উঁচু রাস্তা ধরে হেঁটে শেষ সীমানা থেকে রাস্তার পাদদেশ কিংবা নদীর পাড় ধরে মূল গেটের কাছে ফেরার ব্যবস্থা রয়েছে। দর্শনার্থীদের কাছে টানতে নদীর পাড়ে কলসি কাঁধে গ্রামীণ রমণী, মৎস্য, পাখি, বাঘ, হরিণসহ জলজ আর বুনো প্রাণীর নানান প্রতিকৃতি পুরো পার্ক জুড়ে। শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নানান ব্যবস্থা।সড়কের দুই পাশে শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে দোলনাসহ বিভিন্ন খেলাধুলার সরঞ্জাম। শিশুরা আনন্দে মেতে উঠে এসব রাইডে চড়ে। এছাড়া বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে বেঞ্চ। নদীর কিনারায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে হারিয়ে যাওয়া সাম্পান, ময়ূরপঙ্খীসহ বিভিন্ন ধরনের নৌকা। বাহারি রঙের এই নৌকাগুলো দেখে আপনার মন হয়ে উঠবে প্রফুল্ল। ঠিক যেন ঘাঘট নদী সেজেছে নববধূর সাজে।

পার্কটির অনেকটা মাঝখানেই রয়েছে মনোরম পরিবেশে ঘেরা ছোট্ট সুন্দর একটা দ্বীপ। দ্বীপটির নাম ‘ছেঁড়া দ্বীপ’। নৌকা দিয়ে যেতে হয় এই দ্বীপটিতে। এখানে নৌকা ভ্রমণ করে অন্যরকম আনন্দ পাবেন। চমৎকার এই দ্বীপটিতে রয়েছে নানান ফুল ও ফলের গাছ।

বনভোজনের আনন্দে মেতে উঠতে চাইলে সে ব্যবস্থাও রয়েছে এখানে। নদীর অন্য পারে তিস্তা, করতোয়া ও যমুনা নামে  তিনটি পিকনিক স্পট রয়েছে। এখানে ২০০-২৫০ জন পর্যটক অনায়াসেই বনভোজনের উল্লাসে মেতে উঠতে পারবেন।

সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এ পার্কটিতে রয়েছে নির্বিঘ্ন নিরাপত্তা। পার্কটির  বিশাল এলাকাজুড়ে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধি, বনজ ও ফলজ বৃক্ষ। সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হল এ পার্ক থেকে উপার্জিত অর্থের ৭৫ শতাংশই ব্যয় হয় প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য। সৈয়দপুর এবং রংপুরের আদর্শ গ্রামে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নির্মিত হয়েছে প্রয়াস স্কুল। আর তাই এই পার্কটিতে প্রবেশের মাধ্যমে আপনি প্রতিবন্ধী শিশুদের সাহায্য করছেন।

যেভাবে যাবেন:

ঢাকার মহাখালী, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর এবং গাবতলি থেকে রংপুরগামী বেশ কয়েকটি বিলাস বহুল এসি ও নন এসি বাস রয়েছে। এসব বাসের ভাড়া ৫শ’ টাকা থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে। এছাড়া কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রংপুর এক্সপ্রেস সোমবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টায় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

প্রয়াস সেনা বিনোদন পার্ক রংপুর শহরের নিসবেতগঞ্জ রোডে অবস্থিত।  এই বিনোদন পার্কটিতে মেডিক্যালের মোড় থেকে রিক্সায় যেতে ৫০ টাকা খরচ পড়বে। আর লাইনের অটো বা সিএনজি-তে যাতায়াত করলে খরচ হবে মাত্র ১০ টাকা।

যেখানে থাকবেন:

রংপুরে বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। চাইলে থ্রি স্টার মানের ড্রিম প্যালেসে থাকতে পারেন। একদিনের জন্য খরচ হবে ১০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। অথবা রংপুরের অন্যান্য আবাসিক হোটেলেও থাকতে পারেন।