সিকিম ও দার্জিলিং ভ্রমন কথন

sikim 1

তানভীর ফুয়াদঃ আগে থেকেই প্লান ছিল এই বছর দেশের বাহিরে ট্যুর দিবো। প্রথমে ভেবেছিলাম কাশ্মীর যাবো, কিন্তু এত সময় হাতে ছিল না দেখে কাশ্মীর বাদ দিলাম । পরবর্তী তে ঠিক করলাম ভুটান + দার্জিলিং, কিন্তু বিভিন্ন কারনে এটাও বাদ পড়লো । পরবর্তী তে সিকিম + দার্জিলিং এর কথা ভাবলাম, যেই ভাবা সেই কাজ। এক্সাম চলছিল দেখে ভিসার এপ্লাই ও করতে পারছিলাম না।

২৪ তারিখ এক্সাম শেষ হওয়ার পর সবকিছু রেডি করে ২৫ তারিখ IVAC যমুনা ফিউচার পার্কে ইন্ডিয়ান ভিসার এপ্লাই করলাম।৪ জন একসাথে এপ্লাই করেছিলাম। দুই জনের ডেলিভারি ডেট ছিল ২ তারিখ, বাকি ২ জনের ছিল ৩ তারিখ। যথারীতি ২ তারিখে ভিসা নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়ালাম।লাইনে আমার সামনের ২ জনের ভিসা রিজেক্ট হতে দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম, ভাবলাম আমার টা ও মনে হয় রিজেক্ট হবে। কিন্তু সবকিছু ঠিকঠাক মত করেছিলাম দেখে আমার টা রিজেক্ট হয়নি।

ঝামেলা হয়েছিল বাকি ২ জন কে নিয়ে,যাদের ভিসা ৩ তারিখ দেওয়ার কথা ছিল।৩ তারিখ তাদের ভিসা দেয়নি,বলেছিল ৪ তারিখ বা নেক্সট দিন।৪ তারিখ যেহেতু বৃহস্পতিবার ছিল সেহেতু নেক্সট দিন মানে ৭ তারিখ দিবে তাদের ভিসা।সিকিমের নির্বাচন ১১ তারিখ সুতরাং ৪ তারিখ ভিসা না পেলে ট্যুর এটা ক্যান্সেল শিওর।নির্বাচনের পরেও সম্ভব না কারন আমাদের এক্সাম আবার মে মাস থেকে শুরু।এটা নিয়ে অনেক টেনশন কাজ করছিল । কিন্তু ভাগ্য ভাল ছিল, তারা ৪ তারিখ ই ভিসা পেয়ে গিয়েছিল ।তাদের ভিসা হাতে পাওয়ার পরই আমরা এপ্রিলের ৫ তারিখের হানিফের এর ঢাকা – বাংলাবান্ধার বাসে টিকিট কেটে ফেললাম। ঢাকা থেকে হানিফের একটা বাস সরাসরি বাংলাবান্ধা যায়, ভাড়া ৭০০ টাকা।

সিকিম যাওয়া জন্য আপনাকে বাংলাবান্ধা – ফুলবাড়ি/ বুড়িমারী -চ্যাংড়াবান্ধা যেকোন একটা পোর্ট সিলেক্ট করতে হবে।বাংলাবান্ধা -ফুলবাড়ি/ বুড়িমারী -চ্যাংড়াবান্ধা যেদিক দিয়ে জান না কেন আপনাকে শিলিগুড়ি হয়ে যেতে হবে।বাংলাবান্ধা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব ১৫-১৭ কিঃমিঃ, আর চ্যাংড়াবান্ধা থেকে দুরত্ব ৮০+ কিঃমিঃ। আর বুড়িমারী -চ্যাংড়াবান্ধা ইমিগ্রেশন এর চেয়ে বাংলাবান্ধা -ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন এ ঝামেলা অনেক কম।এজন্য আমরা বাংলাবান্ধা – ফুলবাড়ি হয়ে গিয়েছিলাম। 


প্রথম রাতঃ ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ৬ টায় বাংলাবান্ধার উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। রাত ১০ টার দিকে বগুড়াতে রাতের খাবার খেয়ে বাসে ঘুম দেই। ভোর ৫.৩০ এর দিকে বাস বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট এ পৌছায়। তখন বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নাই কারন ইমিগ্রেশন খুলবে সকাল ৯ টায়।বর্ডারের আশপাশ দিয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটির পর সকাল ৮ টার দিকে নাস্তা করে অপেক্ষা করতে থাকি।ইমিগ্রেশন খোলার সাথে সাথেই আমরা ৫১০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে যাই।ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকে দিয়ে যাওয়া ভাল,তাহলে সময় বাচবে। জনপ্রতি ৫০+৫০ স্পিড মানি  ৫০ টাকা বর্ডার উন্নয়ন ফি দিয়ে কাজ শেষ করি। টাকা ছাড়া এখানে আপনি কাজ শেষ করতে পারবেন না সুতরাং কিছু দেওয়া ভাল।বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন এর লোকজন এর ব্যাবহার যথেস্ট ভাল,স্টুডেন্ট বললে কিছু কম রাখে। কিন্তু ইন্ডিয়াতে জনপ্রতি ১০০+ ১০০ টাকা দিতেই হবে,কোন মাফ নাই বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে ঢুকে পড়ি ইন্ডিয়াতে।বিএসএফ পাসপোর্ট চেক করে সবাইকে অটো তে উঠিয়ে দেয়।হেটে গেলে ১ মিনিট ও লাগে না, কিন্তু তারা এত ভাল যে এই পথটুকুও আপনাকে হাটতে দিবে না।অটোতে করে ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন এ পৌছে দিবে,বিনিময়ে জনপ্রতি ১৫ টাকা করে নিবে ।ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন এ কিছুটা সময় লেগেছে।
খরচঃ ঢাকা-বাংলাবান্ধা বাস ভাড়া =৭০০
খাবার=১৫০
ট্যাভেল ট্যাক্স+ ইমিগ্রেশন +অটো=৮৬৫
মোট=১৭১৫ টাকা
প্রথম দিনঃ ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে ১১ টার সময় আমরা মানি এক্সচেঞ্জ করতে চলে যাই।বর্ডার থেকে মানি এক্সচেঞ্জ করা ভাল,অন্যখানে রেট কম দেয় কিছুটা। এখানে সিন্ডিকেট আছে,সবাই এক রেট বাংলা টাকায় ৭৯ করে দিতে চেয়েছিল।অনেকগুলা মানি এক্সচেঞ্জার যাচাই বাছাই করে আমরা গিয়েছিলাম “মজুমদার এন্টারপ্রাইজ” এ। মজুমদার এ অনেকক্ষন কথাবার্তা বলার পর উনি আমাদের ৮০ টাকা করে দিতে রাজি হলেন,কিন্তু শর্ত ছিল অন্য কাউকে বলা যাবেনা। আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর ৮০.৫০ টাকা করে দিলেন ।উনার থেকে শুনে আমরা জনপ্রতি ১০ রুপি অটো ভাড়া দিয়ে ফুলবাড়ি বাজারে গিয়েছিলাম সিম কিনতে।বর্ডারের আশপাশ থেকে সিম কেনা ভাল,অন্যখানে সিম নেওয়া ঝামেলা আবার দাম ও কিছুটা বেশি।সিকিমে Vodafone এর সার্ভিস তুলনামূলক ভাল।

ফুলবাড়ি থেকে সিম কেনার পর আমরা অটোতে জনপ্রতি ২৫ রুপি ভাটা দিয়ে চলে যাই SNT(Sikkim nationalized transport) তে।ওখনাথেকে সিকিম ভ্রমনের অনুমতি নেই ।এখানে দালালের অভাব নাই। বলবে যে চলেন পারমিশন করে দেই, নর্থ সিকিমের প্যাকেজ দেই। ভুলেও কোন দালালের খপ্পরে পড়ে শিলিগুড়ি থেকে প্যাকেজ নিবেন না। SNT তে গিয়ে পাসপোর্ট এর ১ ফটোকপি,ভিসার ১ ফটোকপি,১ টা পাসপোর্ট সাইজের ফটো, আর উনারা যে ফর্ম টা দিবে ওইটা পূরন করে জমা দিলেই অনুমতি দিয়ে দিবে।আপনি যে কয়দিনের অনুমতি চাইবেন সেই কয়দিনের ই অনুমতি দিবে।চাইলে র‍্যাংপো থেকেও অনুমতি নিতে পারবেন কিন্তু র‍্যাংপো তে সময় বেশি লাগে,এজন্য SNT থেকেই অনুমতি নেওয়া উচিত। সিকিমের অনুমতি ILP(Inner line permit) যেটা দিবে,প্রথমে ওইটার ১০ কপি ফটোকপি করে রাখবেন। আর ওইটার মেইন কপি টা খুব যত্ন করে রাখবেন,কারন সিকিমে প্রবেশ করার জন্য ওইটা অবশ্যই লাগবে।

অনুমতি নেওয়া শেষ হলে আমরা জনপ্রতি ১৫০ টাকা দিয়ে শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক এর বাসের টিকিট কেটে ফেলি।আপনারা চাইলে শেয়ার জীপ, বা কার রিজার্ভ করে ও যেতে পারবেন।শেয়ার জীপের ভাড়া ২৫০ রুপি,এসি বাসের ভাড়া ২৫০ রুপি, নন এসি ১৫০ রুপি করে।জীপ বা বাস যেটাতে করেই যান না কেনো, ড্রাইভার কে আগে থেকেই বলে রাখবেন যে র‍্যাংপো চেকপোস্ট এ জেনো ১০ মিনিট ওয়েট করে।কারন ওখান থেকে পাসপোর্ট এ এন্ট্রি সিল মারতে হবে।আগে থেকে বলে না রাখলে এক্সট্রা চার্জ করতে পারে।আমাদের বাস ছিল ১.৩০ এ।শিলিগুড়ি তে তাড়াতাড়ি করে দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে উঠে পড়ি।বাস যথাসময়ে যাত্রা শুরু করলো।বাস ছাড়ার পরই শুরু হল প্রচন্ড বৃষ্টি।বৃষ্টির কারনে বাস একটু ধীরে চলছিল।প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ও পাহাড় দেখতে দেখতে চলে আসলাম র‍্যাংপো চেকপোস্ট এ।র‍্যাংপো তে পাসপোর্ট ও SNT থেকে যে পারমিশন নিয়েছিলাম ওইটা দেখালেই পাসপোর্ট এ এন্ট্রি সিল মেরে দিবে।যেকোন একজন সবার পাসপোর্ট আর SNT এর পারমিশন পেপার নিয়ে গেলেই হবে।পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে অবশেষে ৬.৩০ এর দিকে চলে আসলাম সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক এ।এখন হোটেল খোজার পালা।২ জন ২ জন করে দুইটা গ্রুপে ভাগ হয়ে হোটেল খুজতে বের হলাম।MG Marg এর আশেপাশে অনেক হোটেল আছে।তবে নিচের দিকের হোটেলগুলার ভাড়া কিছুটা কম।

আমরা MG Marg এর নিচের দিকে,পুলিশ স্টেশনের কিছুটা সামনের “হোটেলে মেরিগোল্ড” এ উঠলাম। হোটেল ভাড়া ছিল পার ডে ৯০০ রুপি।হোটেল ঠিক করার পর আমরা চলে গেলাম নর্থ সিকিম এর প্যাকেজ নিতে।যেহেতু আমরা ৪ জন ছিলাম এজন্য TOB তে পোস্ট দিয়েছিলাম কোন গ্রুপের সাথে শেয়ারে নর্থ সিকিমের প্যাকেজ নেওয়ার জন্য।প্রথমে ৩ জন পেয়েছিলাম পরে তাদের সাথে আরো ২ জন এড হয়েছিল।উনারা ছিলেন হোটেল অন্নপূর্ণা তে। ওই হোটেল থেকে আমরা ২ দিন এক রাতের (লাচুং,ইয়ামথাং ভ্যালির)প্যাকেজ নিয়েছিলাম ১২৫০০ রুপি দিয়ে।সিকিম রেস্ট্রিকটেড এরিয়া হওয়াতে আপনার ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ঘুরতে হবে। পারমিশন এর জন্য ৩ কপি পাসপোর্ট এর ফটোকপি, ৩ কপি ভিসার ফটোকপি, ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের ফটো ও ILP এর ফটোকপি লাগবে। হোটেল থেকে প্যাকেজ না নিয়ে সরাসরি ট্রাভেল এজেন্সি থেকে প্যাকেজ নেওয়া উচিত,তাহলে খরচ কম পড়বে।আমাদের হাতে সময় কম ছিল দেখে তাড়াতাড়ি হোটেল থেকে প্যাকেজ নিয়েছিলাম। গ্যাংটক এ ৯ টা বাজতে বাজতেই প্রায় সবকিছু ক্লোজ হয়ে যায়,সুতরাং ৯ টার আগেই সবকিছু শেষ করার চেষ্টা করবেন।আর প্যাকেজ নেওয়ার সময় অবশ্যই জিজ্ঞাসা করে নিবেন যে কয়টা লান্স,ডিনার, ব্রেকফাস্ট দিবে আর লাচুং এ কেমন হোটেলে রাখবে।কারন অনেকসময় লাচুং এ কাঠের তৈরি হোটেলে রাখে,প্রচন্ড শীত হওয়াতে কাঠের হোটেলে থাকা অনেক কষ্টকর। আর MG Marg থেকে নর্থ সিকিমের গাড়ি যেখান থেকে ছাড়ে ওইখানে যেতে কিন্তু ট্যাক্সি ভাড়া ১৫০ রুপি লাগে।উনাদের বলে রাখবেন যে উনারা জেন ট্যাক্সি ভাড়া করে ওখানে নিয়ে যায়, তাহলে আর অতিরিক্ত ১৫০ রুপি গুনতে হবে না। আমাদের প্যাকেজ এ ছিল বুফে স্টাইলে ২ টা লান্স,১ টা ডিনার ও একটা ব্রেকফাস্ট। ওইদিনের মত কাজ শেষ করে জান্নাত হোটেল থেকে বিরিয়ানি খেয়ে হোটেলে এসে তাড়াতাড়ি ঘুম দিলাম।কারন পরদিন সকাল ৯.৩০ টায় নর্থ সিকিমের উদ্দ্যশ্যে রওনা দিতে হবে। 
খরচঃ৬৮৫ রুপি = ৮৫০ টাকা (জনপ্রতি)

।তাদের ভিসা হাতে পাওয়ার পরই আমরা এপ্রিলের ৫ তারিখের হানিফের এর ঢাকা – বাংলাবান্ধার বাসে টিকিট কেটে ফেললাম। ঢাকা থেকে হানিফের একটা বাস সরাসরি বাংলাবান্ধা যায়, ভাড়া ৭০০ টাকা।সিকিম যাওয়া জন্য আপনাকে বাংলাবান্ধা – ফুলবাড়ি/ বুড়িমারী -চ্যাংড়াবান্ধা যেকোন একটা পোর্ট সিলেক্ট করতে হবে।বাংলাবান্ধা -ফুলবাড়ি/ বুড়িমারী -চ্যাংড়াবান্ধা যেদিক দিয়ে জান না কেন আপনাকে শিলিগুড়ি হয়ে যেতে হবে।বাংলাবান্ধা থেকে শিলিগুড়ির দূরত্ব ১৫-১৭ কিঃমিঃ, আর চ্যাংড়াবান্ধা থেকে দুরত্ব ৮০+ কিঃমিঃ। আর বুড়িমারী -চ্যাংড়াবান্ধা ইমিগ্রেশন এর চেয়ে বাংলাবান্ধা -ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন এ ঝামেলা অনেক কম।এজন্য আমরা বাংলাবান্ধা – ফুলবাড়ি হয়ে গিয়েছিলাম। 


প্রথম রাতঃ ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ৬ টায় বাংলাবান্ধার উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। রাত ১০ টার দিকে বগুড়াতে রাতের খাবার খেয়ে বাসে ঘুম দেই। ভোর ৫.৩০ এর দিকে বাস বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট এ পৌছায়। তখন বসে বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় নাই কারন ইমিগ্রেশন খুলবে সকাল ৯ টায়।বর্ডারের আশপাশ দিয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটির পর সকাল ৮ টার দিকে নাস্তা করে অপেক্ষা করতে থাকি।ইমিগ্রেশন খোলার সাথে সাথেই আমরা ৫১০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স দিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে যাই।ট্রাভেল ট্যাক্স ঢাকা থেকে দিয়ে যাওয়া ভাল,তাহলে সময় বাচবে। জনপ্রতি ৫০+৫০ স্পিড মানি ৫০ টাকা বর্ডার উন্নয়ন ফি দিয়ে কাজ শেষ করি। টাকা ছাড়া এখানে আপনি কাজ শেষ করতে পারবেন না সুতরাং কিছু দেওয়া ভাল।বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন এর লোকজন এর ব্যাবহার যথেস্ট ভাল,স্টুডেন্ট বললে কিছু কম রাখে। কিন্তু ইন্ডিয়াতে জনপ্রতি ১০০+ ১০০ টাকা দিতেই হবে,কোন মাফ নাই বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে ঢুকে পড়ি ইন্ডিয়াতে।বিএসএফ পাসপোর্ট চেক করে সবাইকে অটো তে উঠিয়ে দেয়।হেটে গেলে ১ মিনিট ও লাগে না, কিন্তু তারা এত ভাল যে এই পথটুকুও আপনাকে হাটতে দিবে না।অটোতে করে ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন এ পৌছে দিবে,বিনিময়ে জনপ্রতি ১৫ টাকা করে নিবে ।ইন্ডিয়ান ইমিগ্রেশন এ কিছুটা সময় লেগেছে।
খরচঃ ঢাকা-বাংলাবান্ধা বাস ভাড়া =৭০০
খাবার=১৫০
ট্যাভেল ট্যাক্স+ ইমিগ্রেশন +অটো=৮৬৫
মোট=১৭১৫ টাকা


প্রথম দিনঃ ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে ১১ টার সময় আমরা মানি এক্সচেঞ্জ করতে চলে যাই।বর্ডার থেকে মানি এক্সচেঞ্জ করা ভাল,অন্যখানে রেট কম দেয় কিছুটা। এখানে সিন্ডিকেট আছে,সবাই এক রেট বাংলা টাকায় ৭৯ করে দিতে চেয়েছিল।অনেকগুলা মানি এক্সচেঞ্জার যাচাই বাছাই করে আমরা গিয়েছিলাম “মজুমদার এন্টারপ্রাইজ” এ। মজুমদার এ অনেকক্ষন কথাবার্তা বলার পর উনি আমাদের ৮০ টাকা করে দিতে রাজি হলেন,কিন্তু শর্ত ছিল অন্য কাউকে বলা যাবেনা। আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর ৮০.৫০ টাকা করে দিলেন ।উনার থেকে শুনে আমরা জনপ্রতি ১০ রুপি অটো ভাড়া দিয়ে ফুলবাড়ি বাজারে গিয়েছিলাম সিম কিনতে।

বর্ডারের আশপাশ থেকে সিম কেনা ভাল,অন্যখানে সিম নেওয়া ঝামেলা আবার দাম ও কিছুটা বেশি।সিকিমে Vodafone এর সার্ভিস তুলনামূলক ভাল।ফুলবাড়ি থেকে সিম কেনার পর আমরা অটোতে জনপ্রতি ২৫ রুপি ভাটা দিয়ে চলে যাই SNT(Sikkim nationalized transport) তে।ওখনাথেকে সিকিম ভ্রমনের অনুমতি নেই ।এখানে দালালের অভাব নাই। বলবে যে চলেন পারমিশন করে দেই, নর্থ সিকিমের প্যাকেজ দেই। ভুলেও কোন দালালের খপ্পরে পড়ে শিলিগুড়ি থেকে প্যাকেজ নিবেন না। SNT তে গিয়ে পাসপোর্ট এর ১ ফটোকপি,ভিসার ১ ফটোকপি,১ টা পাসপোর্ট সাইজের ফটো, আর উনারা যে ফর্ম টা দিবে ওইটা পূরন করে জমা দিলেই অনুমতি দিয়ে দিবে।আপনি যে কয়দিনের অনুমতি চাইবেন সেই কয়দিনের ই অনুমতি দিবে।চাইলে র‍্যাংপো থেকেও অনুমতি নিতে পারবেন কিন্তু র‍্যাংপো তে সময় বেশি লাগে,এজন্য SNT থেকেই অনুমতি নেওয়া উচিত।

সিকিমের অনুমতি ILP(Inner line permit) যেটা দিবে,প্রথমে ওইটার ১০ কপি ফটোকপি করে রাখবেন। আর ওইটার মেইন কপি টা খুব যত্ন করে রাখবেন,কারন সিকিমে প্রবেশ করার জন্য ওইটা অবশ্যই লাগবে। অনুমতি নেওয়া শেষ হলে আমরা জনপ্রতি ১৫০ টাকা দিয়ে শিলিগুড়ি থেকে গ্যাংটক এর বাসের টিকিট কেটে ফেলি।আপনারা চাইলে শেয়ার জীপ, বা কার রিজার্ভ করে ও যেতে পারবেন।শেয়ার জীপের ভাড়া ২৫০ রুপি,এসি বাসের ভাড়া ২৫০ রুপি, নন এসি ১৫০ রুপি করে।জীপ বা বাস যেটাতে করেই যান না কেনো, ড্রাইভার কে আগে থেকেই বলে রাখবেন যে র‍্যাংপো চেকপোস্ট এ জেনো ১০ মিনিট ওয়েট করে।কারন ওখান থেকে পাসপোর্ট এ এন্ট্রি সিল মারতে হবে।আগে থেকে বলে না রাখলে এক্সট্রা চার্জ করতে পারে।আমাদের বাস ছিল ১.৩০ এ।শিলিগুড়ি তে তাড়াতাড়ি করে দুপুরের খাবার খেয়ে বাসে উঠে পড়ি।বাস যথাসময়ে যাত্রা শুরু করলো।বাস ছাড়ার পরই শুরু হল প্রচন্ড বৃষ্টি।বৃষ্টির কারনে বাস একটু ধীরে চলছিল।প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ও পাহাড় দেখতে দেখতে চলে আসলাম র‍্যাংপো চেকপোস্ট এ।র‍্যাংপো তে পাসপোর্ট ও SNT থেকে যে পারমিশন নিয়েছিলাম ওইটা দেখালেই পাসপোর্ট এ এন্ট্রি সিল মেরে দিবে।যেকোন একজন সবার পাসপোর্ট আর SNT এর পারমিশন পেপার নিয়ে গেলেই হবে।পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পাড়ি দিয়ে অবশেষে ৬.৩০ এর দিকে চলে আসলাম সিকিমের রাজধানী গ্যাংটক এ।এখন হোটেল খোজার পালা।২ জন ২ জন করে দুইটা গ্রুপে ভাগ হয়ে হোটেল খুজতে বের হলাম।MG Marg এর আশেপাশে অনেক হোটেল আছে।

তবে নিচের দিকের হোটেলগুলার ভাড়া কিছুটা কম।আমরা MG Marg এর নিচের দিকে,পুলিশ স্টেশনের কিছুটা সামনের “হোটেলে মেরিগোল্ড” এ উঠলাম। হোটেল ভাড়া ছিল পার ডে ৯০০ রুপি।হোটেল ঠিক করার পর আমরা চলে গেলাম নর্থ সিকিম এর প্যাকেজ নিতে।যেহেতু আমরা ৪ জন ছিলাম এজন্য TOB তে পোস্ট দিয়েছিলাম কোন গ্রুপের সাথে শেয়ারে নর্থ সিকিমের প্যাকেজ নেওয়ার জন্য।প্রথমে ৩ জন পেয়েছিলাম পরে তাদের সাথে আরো ২ জন এড হয়েছিল।উনারা ছিলেন হোটেল অন্নপূর্ণা তে। ওই হোটেল থেকে আমরা ২ দিন এক রাতের (লাচুং,ইয়ামথাং ভ্যালির)প্যাকেজ নিয়েছিলাম ১২৫০০ রুপি দিয়ে।সিকিম রেস্ট্রিকটেড এরিয়া হওয়াতে আপনার ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ঘুরতে হবে। পারমিশন এর জন্য ৩ কপি পাসপোর্ট এর ফটোকপি, ৩ কপি ভিসার ফটোকপি, ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের ফটো ও ILP এর ফটোকপি লাগবে। হোটেল থেকে প্যাকেজ না নিয়ে সরাসরি ট্রাভেল এজেন্সি থেকে প্যাকেজ নেওয়া উচিত,তাহলে খরচ কম পড়বে।আমাদের হাতে সময় কম ছিল দেখে তাড়াতাড়ি হোটেল থেকে প্যাকেজ নিয়েছিলাম।

গ্যাংটক এ ৯ টা বাজতে বাজতেই প্রায় সবকিছু ক্লোজ হয়ে যায়,সুতরাং ৯ টার আগেই সবকিছু শেষ করার চেষ্টা করবেন।আর প্যাকেজ নেওয়ার সময় অবশ্যই জিজ্ঞাসা করে নিবেন যে কয়টা লান্স,ডিনার, ব্রেকফাস্ট দিবে আর লাচুং এ কেমন হোটেলে রাখবে।কারন অনেকসময় লাচুং এ কাঠের তৈরি হোটেলে রাখে,প্রচন্ড শীত হওয়াতে কাঠের হোটেলে থাকা অনেক কষ্টকর। আর MG Marg থেকে নর্থ সিকিমের গাড়ি যেখান থেকে ছাড়ে ওইখানে যেতে কিন্তু ট্যাক্সি ভাড়া ১৫০ রুপি লাগে।উনাদের বলে রাখবেন যে উনারা জেন ট্যাক্সি ভাড়া করে ওখানে নিয়ে যায়, তাহলে আর অতিরিক্ত ১৫০ রুপি গুনতে হবে না। আমাদের প্যাকেজ এ ছিল বুফে স্টাইলে ২ টা লান্স,১ টা ডিনার ও একটা ব্রেকফাস্ট। ওইদিনের মত কাজ শেষ করে জান্নাত হোটেল থেকে বিরিয়ানি খেয়ে হোটেলে এসে তাড়াতাড়ি ঘুম দিলাম।কারন পরদিন সকাল ৯.৩০ টায় নর্থ সিকিমের উদ্দ্যশ্যে রওনা দিতে হবে। 
খরচঃ৬৮৫ রুপি = ৮৫০ টাকা (জনপ্রতি)

দ্বিতীয় দিনঃপরদিন সকাল ৯ টায় ঘুমথেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে হোটেলে চেক আউট করে বের হই।আর আমাদের ব্যাগ হোটেলে রেখে এসেছিলাম,বলেছিলাম যে নর্থ সিকিম থেকে ফিরে এসে এই হোটেলেই উঠবো। হোটেলের সামনের এক রেস্টুরেন্ট থেকে সকালের নাস্তা করে নেই। তারপর MG Marg এ কিছুক্ষণ হাটাহাটি করার পর নর্থ সিকিমের গাড়িতে উঠে পড়ি।আমাদের” বলেরো ম্যাক্স “গাড়ি দিয়েছিল,৯ জন ইজিলি বসতে পেরেছিলাম।১০ টার দিকে গাড়ি ছাড়ার কথা থাকলেও ছাড়তে ছাড়তে ১১ টা বেজে গিয়েছিল প্রায়।গ্যাংটক থেকে লাচুং এর দূরত্ব প্রায় ১১০ কিমি,সম্পূর্ণ টা পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। ৫ ঘন্টার উপর সময় লাগে যেতে। যাওয়ার সময় মনে হবে একবার উপরে উঠছি আরেকবার মনেহবে নিচে নামছি।

সিকিমের ওয়েদার কিছুক্ষণ পর পর চেইঞ্জ হয়, এই বৃষ্টি তো এই রোদ আবার মেঘে ঢাকা। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ের যে রুপ দেখেছিলাম যেগুলা আসলে বর্ননা দিয়ে বোঝানো সম্ভব না।মাঝেমধ্যে তো এমন ও মনে হচ্ছিল যে মেঘ বোধহয় হাতের মুঠোতে চলে আসবে।দুপুর ১.৩০ এ প্যাকেজ এর লান্স করে আবার গাড়িতে উঠে বসলাম। যাওয়া সময় তিস্তা নদী সামনে পড়বে।এত স্বচ্ছ নীল পানি আমি আগে কখনো দেখিনি ।বড় বড় ২ টা অসাধারণ সুন্দর ঝর্না ও সামনে পড়বে।দেখলেই বোঝা যায় যে বৃষ্টি হওয়াতে ঝর্না গুলা তাদের যৌবন ফিরে পেয়েছে।পাহাড়গুলা মেঘে ঢাকা ছিল দেখে তখনো আমরা বরফের দেখা পায়নি,অধীর আগ্রহে ছিলাম যে কখন বরফের দেখা মিলবে।

রাস্তার মধ্যে ড্রাইভার সাহেব অলরেডি কয়েকবার প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছেন যে “কাটাও” নামক একটা জায়গা আছে ওখানে প্রচুর বরফ আছে।কাটাও কিন্তু প্যাকেজ এ নাই,এটার জন্য এক্সট্রা চার্জ দিতে হবে।ড্রাইভার রা কিন্তু বারবার বলবে ইয়ামথাং ভ্যালি(Yumthang Valley) তে বরফ নাই এই সেই, ভুলেও তাদের কথা শুনে কাটাও যাবেন না।উপরের দিকে উঠতে উঠতে হঠাৎ করে দূরের পাহাড়ে বরফের সন্ধান পেলাম ।যত উপরের দিকে উঠছি শীতের পরিমাণ তত বাড়ছে।অবশেষে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে আমরা লাচুং এসেছিলাম।আমাদের নিয়ে গিয়েছিল “হোটেল ভিক্টোরিয়া” তে,খুব সুন্দর হোটেল।৯ জনের জন্য ৩ টা রুম দিয়েছিল,প্রতি রুমে ৩ টা করে সিঙ্গেল বেড ছিল।কয়েকটা পোস্ট পড়েছিলাম যে লাচুং এর হোটেলে কারেন্ট থাকেনা,এই ওই কিন্তু আমাদের তেমন কোন প্রব্লেম ই হয়নি ।রাত ৮ টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে রুমে এসে কয়েকটা বাংলা গান শুনে(২/৩ দিন ধরে গাড়িতে হিন্দি গান শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম) ঘুম দিলাম,কারন পরদিন সকাল ৬ টার মধ্যে বের হতে হবে। 
খরচঃ ১৪৪০ রুপি =১৭৯০ টাকা (জনপ্রতি)

তৃতীয় দিনঃ ৫.৩০ এর দিকে ঘুমথেকে উঠার পর রিমন ভাই ডেকে বললো যে ভাই বাইরে বরফ দেখা যাচ্ছে। আমি ভাবলাম হয়তো ফাজলামো করছে,বাইরে গিয়ে নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লেগেছিল আমার। দেখি যে হোটেলের সাথের পাহাড় বরফে ঢেকে আছে,আর সকালের সূর্যের আলোতে কেমন জেনো চিকচিক করছে। ৬ টার দিকে প্যাকেজের নাস্তা (ম্যাগী নুডুলস আর চা) খেয়ে হোলেটের নিচ থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা করে গামবুট ভাড়া নিয়ে ইয়ামথাং(Yumthang Valley) এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

বরফে হাটতে হলে অবশ্যই গামবুট ভাড়া নিতেই হবে।সিকিম কে বলাহয় Land of Organic, এখানে সবকিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ফ্রেশ।লাচুং থেকে ইয়ামথাং ভ্যালিতে যাওয়ার সময় সমস্ত প্লাস্টিকের বোতল রেখে যেতে হবে,না হলে ধরা পড়লে ৫০০ রুপি জরিমানা করবে কিন্তু। লাচুং থেকে ইয়ামথাং ভ্যালির দূরত্ব ২৬ কিমি এর মত,কিন্তু বরফের কারনে রাস্তা বন্ধ থাকে বলে পুরাটা যেতে পারবেন না।সকাল ৭.২০ এর দিকে আমাদের ইয়ামথাং ভ্যালির ১২ কিমি আগে নামিয়ে দিয়েছিল।দূর থেকে বরফ ঢাকা পাহাড় দেখা যাচ্ছে, কিন্তু মনে হচ্ছিলো যে সেটা হয়তো অনেক দূরে।গ্রুপের কয়েকজন তো খুব হতাশ হল।আমরা ২/৩ জন চিন্তা করলাম যে বরফ হাতে নিবোই,যতদূর হাটা লাগে হাটবো।হাটার সময় এমন কিছু দৃশ্য দেখলাম সেগুলা শুধু চোখের দেখাতেই সুন্দর। কোন ক্যামেরা দ্বারা এ সৌন্দ্যর্য ধারন করা সম্ভব না। মনে হচ্ছিল পৃথিবীর বাইরে অন্যকোথাও চলে আসছি।আল্লাহর সৃষ্টি এত সুন্দর হতে পারে না দেখলে বোঝা সম্ভব না।

পাহাড় গুলার দিকে যতবারই তাকই ততবারই নতুন মনেহয় নতুন করে দেখছি। প্রায় ৩/৪ কিমি হাটার পর বরফের স্তুপ এর সন্ধান পেলাম।এখানে প্রায় ৪ ঘন্টার মত বরফ ছোড়াছুড়ি করে ১১.৩০ এর দিকে গাড়িতে উঠে লাচুং ওই হোটেলে গেলাম। এখান থেকে ব্যাগ গুছিয়ে প্যাকেজের লান্স করে ১২.৩০ এর দিকে আবার গ্যাংটক এর উদ্দ্যেশ্য রওনা হলাম।যাওয়ার সময় বৃষ্টি ছিল না দেখে পাহাড়ের অন্য রুপ দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ৬.৩০ এর দিকে গ্যাংটক এ পৌছে গেলাম।গ্রুপের বাকি ৫ জন শিলিগুড়ির গাড়িতে উঠলো আর আমরা ৪ জন ৩০০ টাকা দিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে “হোটেল মেরিগোল্ড ” এ চলে আসলাম।হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে সাঙ্গু লেকের প্যাকেজ নেওয়ার জন্য এজেন্সি তে গেলাম।যে এজেন্সির মাধ্যমে(Newman Tours & Travels) ইয়ামথাং গেছিলাম ওই এজেন্সির মাধ্যমেই সাঙ্গু লেক এর প্যাকেজ নিয়েছিলাম ৩৫০০ টাকা দিয়ে।এখানেও সবকিছু ৩ কপি করে লাগবে। সবকিছু শেষ করে ডেনজং সিনেমা হলের পেছন থেকে “আসলাম হোটেলে” রাতের খাবার খেয়ে MG Marg এ ঘোরাঘুরি করি।পরে রাত ১০ টার দিকে ডমিনোজ পিজ্জা(বাংলাদেশে চান্স পায়নি খেয়ে হোটেলে এসে ঘুম দেই। 
খরচঃ৬৭০ রুপি=৮৩০ টাকা।

চতুর্থ দিনঃসকাল ৭ টায় আসলাম হোটেল থেকে নাস্তা করে ৭.৩০ এ সাঙ্গু লেকের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হই।”মাহিন্দ্র বলেরো ” গাড়ি দিয়েছিল আমাদের। সাঙ্গু লেক ১৪০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। সাঙ্গু লেকে যাওয়ার রাস্তাটা ভয়ংকর রকমের সুন্দর।ইউটিউবে, টিভিতে এমন রাস্তা অনেক দেখেছি কিন্তু বাস্তবে এটাই প্রথম।যত উপরের দিকে উঠছি ততই ঠান্ডার পরিমাণ বেড়েই চলছে,প্রচন্ড রকমের ঠান্ডা। সাঙ্গু লেকে উঠার সময় হঠাৎ করে দেখি চারিদিকে মেঘে ঢেকে গেল।সিকিমের ওয়েদার বোঝা বড় দায়,এখন একরকম তো ১০ মিনিট পর চেইঞ্জ।সাঙ্গু লেকে আসার পর বুঝলাম ঠান্ডা কাকে বলে,তাপমাত্রা – এর অনেক নিচে ছিল।পুরা লেক শুভ্র বরফের চাদরে ঢেকে গেছে।লেকের পানি বরফ হয়ে জমে আছে। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল প্রব্লেম শুধু ছিল ওয়েদার,চারিদিকে মেঘে ঢেকে গিয়েছিল।তখন একটু মন খারাপ হয়েছিল যে এভাবে থাকলে তো ভালভাবে দেখতে পারবো না ।গাড়িতে আসার সময় ড্রাইভার কে বারবার করে জিজ্ঞাসা করছিলাম যে আজ স্নো ফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে নাকি।উনি প্রতিবারই এমনভাবে বললেন যে সম্ভাবণা ০%।৫/৬ দিন আগে নাকি একবার হয়েছিল। হঠাৎ ই রোদের দেখা পেয়ে মন ভাল হয়ে গেল ।

কিছুক্ষণ বরফ ছোড়াছুড়ি করার পর দেখি স্নো ফল হচ্ছে।কতক্ষণ চিন্তা করলাম যে সত্যিই কি স্নো ফল হচ্ছে নাকি চোখের বিভ্রম। না চোখ ঠিকই আছে, আসলেই তো স্নো ফল হচ্ছে।সাঙ্গু লেকের সৌন্দ্যর্য বর্ননা করার মত না। সাঙ্গু লেক নিয়ে বলতে গেলে লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে।সিকিমের সবচেয়ে সুন্দর প্লেস সাঙ্গু লেক। দুপুর ১.২০ এর দিকে আমরা সাঙ্গু লেক থেকে গ্যাংটক এর উদ্দেশ্যে রওনা দেই,তখন প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হচ্ছিল।আসার সময় আড়াই ঘন্টার রাস্তা ১.৩০ ঘন্টায় শেষ করেছিল ড্রাইভার সাহেব,অনেক ভাল গাড়ি চালায় উনি। গ্যাংটক এ এসে ২০০ রুপি ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে আমরা চলে যাই দার্জিলিং স্টান্ডে,কারন পরবর্তী গন্তব্য দার্জিলিং। এখান থেকে জনপ্রতি ২৫০ রুপি দিয়ে শেয়ার ট্যাক্সির টিকিট কাটি।টিকিট কাটা শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়ে দার্জিলিং এর উদ্দেশ্যে রওনা হই। যাওয়ার সময় র‍্যাংপো থেকে এক্সিট সিল মেরে নেই।যাওয়ার সময় অবশ্যই এক্সিট সিল মেরে নিতে হবে,না হলে পরবর্তী তে ঝামেলা হবে।আঁকাবাকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে রাত ৮ টার দিকে দার্জিলিং চলে আসলাম।দার্জিলিং এ এসে তাড়াতাড়ি করে মল রোডের নিচেরদিকে একটা হোটেলে উঠি(হোটেলের নামটা ভুলে গেছি),হোটেল ভাড়া ১০০০ টাকা।দার্জিলিং এ অনেক হোটেল আছে,পছন্দমতো খুজে নিতে পারবেন।সবকিছু ঠিকঠাক করে ৯.১৫ এর দিকে রাতের খাবার খেতে বের হয়েছিলাম,ততক্ষনে প্রায় সবগুলা রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে।হাতেগোনা কয়েকটা খোলা ছিল, কিছুক্ষণ খুজে স্থানীয় একজন লোকের সাহায্য নিয়ে একটা বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট এ গিয়েছিলাম রাতের খাবার খেতে। রাতের খাবার শেষ করে হোটেলে এসে পনেরদিনের সাইট সিয়িং এর জন্য গাড়ি ঠিক করলাম।১১ টা স্পট দেখাবে, ভাড়া ২৫০০ রুপি।ওইদিন তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কারন রাত ৩.৩০ এর দিকে উঠে টাইগার হিলে সূর্যদয় দেখতে হবে। 
খরচঃ১৮২০ রুপি= ২২৬০ টাকা (জনপ্রতি)

পঞ্চম দিনঃ ভোর ৪ টার সময় টাইগার হিলের উদ্দ্যশ্যে রওনা হলাম।টাইগার হিলের প্রধান আকর্ষণ হল সূর্যদয়।চেষ্টা করবেন ভোর ৪-৪.৩০ এর মধ্যে বের হতে, না হলে কিন্তু সূর্যদয় মিস করবেন।যেতে ৩০ মিনিটের মত সময় লাগবে। সূর্য উঠার সময় সূর্যের আলো কাঞ্চনজঙ্ঘা এর উপর পড়লে কাঞ্চনজঙ্ঘার একটা গোল্ডেন ভিউ আসে,যেটা এককথায় অসাধারণ। টাইগার হিলে সূর্যদয় দেখে আমরা চলে গেলাম ঘুম মনেস্ট্রি তে। এটা বৌদ্ধদের একটা মন্দির। ঘুম মনেস্ট্রি থেকে আসলাম বাতাসিয়া লুপ এ।এখানে ঢুকতে জনপ্রতি ২০ রুপির টিকিট কাটতে হবে।বাতাসিয়া লুপে টেলিস্কোপ এর মাধ্যমে কাঞ্চনজঙ্ঘা সহ কয়েকটা স্পষ্ট দেখার ব্যাবস্থা আছে মাত্র ২০ রুপিতে,চাইলে দেখতে পারেন।বাতাসিয়া লুপের এখান থেকে হালকা নাস্তা করে চলে গেলাম রক গার্ডেন এ।রক গার্ডেন এ যাওয়ার পথে খুব সুন্দরভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। রক গার্ডেন থেকে চলে আসলাম দার্জিলিং চিড়িয়াখানায়।তারপর গেলাম রোপ ওয়ে তে।ওইখানথেকে টি গার্ডেন।টি গার্ডেন এর আশেপাশে চা বিক্রি করে,তবে এগুলা অরিজিনাল না।

অরিজিনাল চা পাবেন মল রোডে Nathmulls এ।২ টা দোকান আছে তাদের,একটা বিগ বাজারের সাথে,আরেকটা একটু সামনে।টি গার্ডেন থেকে পিস প্যাগোডা হয়ে তেনজিং রক দেখে ১২.৩০ এর দিকে হোটেলে ব্যাক করলাম।হোটেল থেকে ফ্রেশ হয়ে মসজিদের পাশের” ইসলামীয়া হোটেল” থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে হোটেলে ব্যাক করলাম।এখানকার খাবার ভাল,দাম ও তূলনামূলক কম।দার্জিলিং থেকে শপিং করতে চাইলে মল রোডের নিচে একটা মার্কেট আছে” চকবাজার ” নাম,এখানথেকে করতে পারেন।কম দামে অনেক ভাল ভাল জিনিস পাবেন।দুপুর ১.৩০ এর দিকে শেয়ার জিপে শিলিগুড়ির উদ্দ্যেশ্যে রওনা হলাম,ভাড়া ১৫০ রুপি।৩.৪০ এর দিকে শিলিগুড়ি চলে আসলাম।শিলিগুড়ি নেমে অটো ভাড়া করে ভেনাস মোড়ে আসলাম। কিছুক্ষণ খোজার পর “হোটেল গোল্ডেন মোমেন্টস” এ উঠলাম, ভাড়া ১২০০ রুপি।শিলিগুড়ির এইদিকে হোটেল ভাড়া বেশি মনে হয়েছে আমার। হোটেলে রেস্ট নিয়ে সন্ধ্যা ৬ টার দিকে অটো নিয়ে শপিং করতে গেলাম বিগ বাজার।বিগ বাজার থেকে পরে শ্রী লেদার্স এ আসছি।শপিং শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে এসে ঘুম দিয়েছি। 
খরচঃ ১৩৭০ রুপি=১৭০০ টাকা(জনপ্রতি)

ষষ্ঠ দিনঃ অন্যান দিনগুলার তুলনায় আজ একটু দেরি করে ঘুমথেকে উঠেছি।ঘুমথেকে উঠে হোটেলের পাশথেকে সকালের নাস্তা করে নেই।তারপর হোটেলে চেকআউট দিয়ে শপিংয়ের জন্য চলে যাই বিধান মার্কেটে। বিধান মার্কেটে জিনিসপত্রের দাম কম আছে,চাইলে এখান থেকে শপিং করতে পারেন। শপিং শেষ করে দুপুরের খাবার খেয়ে,৩ টার দিকে অটো রিজার্ভ করে ফুলবাড়ি ইমিগ্রেশন এ চলে আসি। আধাঘন্টার ভেতর ইমিগ্রেশন এর কাজ + মানি এক্সচেঞ্জে করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি। বাংলাদেশে এসেই হানিফ বাসের টিকিট কাটি,আসার সময় যে বাসে এসেছিলাম ওইটাতেই।আধাঘন্টার মধ্যে ইমিগ্রেশন এর কাজ শেষ করে ওয়েটিং রুমে বসে বাসের অপেক্ষা করতে থাকলাম।৬.৪০ এ বাস ছাড়লো।মাঝে তেতুলিয়া তে রাতের খাবারের জন্য ৩০ মিনিটের যাত্রা বিরতি দিয়েছিল।রাতের খাবার খেয়েছিলাম নুরজাহান হোটেলে,এখানকার খাবার+ সার্ভিস খুব ভাল আবার দামেও সস্তা।পরদিন সকাল ৯.৪৫ এ ঢাকা এসে পৌছেছিলাম।জ্যামের কারনে দেরি হয়েছে কিছুটা। 
খরচঃ ২৪৫ রুপি=৩০৪ টাকা +৯০১ টাকা =১২০৫(জনপ্রতি) টাকা

মোট খরচ=১৭১৫+৮৫০+১৭৯০+৮৩০+২২৬০+১৭০০+১২০৫=১০৩৫০ টাকা প্রায়(জনপ্রতি)
প্রয়োজনীয় কিছু কথাঃ
* সিকিমে যেতে চাইলে চেষ্টা করবেন ৬/৭ জনের গ্রুপ করে যেতে, তাহলে খরচ কম হবে।
* প্রচন্ড ঠান্ডা মোকাবেলা করার জন্য ভারী জ্যাকেট,থার্মাল ইনার,হাতমোজা, উলের পা মোজা নিবেন। 
* গাড়িতে করে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উপরে উঠলে বমি বমি ভাব বা মাথাব্যাথা করতে পারে।পর্যাপ্ত পরিমাণে মাথাব্যথা,বমি, গ্যাস্ট্রিক এর ঔষধ সাথে রাখবেন। 
* যেকোন সময় বৃষ্টি হতে পারে, এজন্য সাথে সব সময় ছাতা রাখবেন।
* পাসপোর্ট, ভিসার ১০ কপি ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের ১০ টা ফটো নিয়ে যাবেন। 
* মানি এক্সচেঞ্জে বর্ডারের থেকেই করে নিবেন।সিম ও বর্ডারের আশপাশ থেকে কেনা ভাল।

কিছু অনুরোধঃ কোথাও ঘুরতে গেলে এমনকিছু করবেন না যেন সেখানকার পরিবেশ নষ্ট হয়।পানির বোতল,চিপস/খাবারের প্যাকেট সহ অপচনশীল জিনিসপত্র যেখানে সেখানে ফেলবেন না,নির্ধারিত স্থানে ফেলুন।স্থানীয়দের সাথে ভাল ব্যাবহার করুন।এমনকিছু বলবেন না যাতে কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে।এমন কোন কাজ করবেন না যেন আপনার জন্য বাংলাদেশীদের বদনাম হয়।