লালপুরে ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন গোসাই আশ্রম

800px-Gosai

সজিবুল ইসলাম হৃদয়, (নাটোর, লালপুর প্রতিনিধি) নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার রামকৃষ্ণপুর পানসীপাড়া গ্রামে গড়ে উঠে ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাইজীর আশ্রম। কারুকার্য করা আশ্রমের প্রথম ফটক দর্শকদের মুগ্ধ করে দেই । নাটোর সহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিনোদন প্রেমী শতশত মানুষ ঘুরতে আসে এই আশ্রমে।

প্রায় ৩১৯ বছরের আগের কথা। শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাই একাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে পশ্চিম বঙ্গের তবন থানার রাধাকান্তপুর গ্রামে শুক্লাপক্ষের পূর্ন্য তিথিতে এক ব্রাক্ষন পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাই মায়াতে মনুষ্যরুপ ধরে লীলার কারনে আবিভূত হয়েছিলেন এই পৃথিবীতে। তিনি এই পৃথিবীতে অবতীর্ন হন শুধু জীবকে পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করার জন্য। তার কাজ হল পথ ভ্রষ্ট মানুষের মধ্যে বিষ্ণুর অবতাররুপে বৈষ্ণব ধর্মাভাব স্থাপন করা। শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাই বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে নিজ বাড়ী থেকে বের হয়ে পড়েছিলেন একাকী। পর্যায়ক্রমে রাঢ়, পাটনা, এলাহাবাদ, হস্তিনাপুর ভ্রমন করে গঙ্গা পার হয়ে পদ্মা নদীর পাড় ঘেষে চলে আসেন বর্তমানে বাংলাদেশের নাটোর জেলার লালপুর উপজেলার পানসীপাড়া নামক স্থানে। ওই আশ্রমের নাম শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাইজীর আশ্রম। নাটোর জেলার লালপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কি.মি. দক্ষিন পশ্চিমে দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের পানসীপাড়া গ্রামে। চারদিকে সবুজ বনানী পাশ দিয়ে প্রমত্তা রুপসী পদ্মা নদী প্রবাহিত। এ গ্রামে রয়েছে ৩১৯ বছরের পুরনো স্থাপত্যের নিদর্শণ। প্রত্নতত্বের অমুল্য সম্পদ শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাইজীর আশ্রম।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় বাংলা ১১০৪ বঙ্গাব্দ সনে তৎকালীন নওপাড়ার জমিদার রায় বাহাদুর লক্ষী নারায়ন ওই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় ১০.৫০ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাইজীর আশ্রম। বর্তমানে সুষ্ঠু  তদারকির অভাবে এ সম্পত্তির অর্ধেক আগে থেকে বে-দখল হয়ে গেছে বলে জানা যায়। এমনকি আশ্রমের বিশাল ভবনের ইট, পাথর, দরজা-জানালার মূল্যবান কাঠ লুটপাঠ হয়ে গেছে। সরকারী, বে-সরকারীভাবে কোন পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তিন শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য আশ্রমটি এখন ধ্বংস স্তুপে পরিণত হতে চলেছে। বর্তমানে তিন সদস্যের কমিটি দ্বারা আশ্রমের সৌন্দর্য রক্ষার কাজে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাইজীর মহিমায় আকৃষ্ঠ হয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভক্তরা ছুটে আসে আশ্রম প্রাঙ্গনে। জমজমাট থাকে সমগ্র গ্রাম। প্রতি বছরের আষাঢ় মাসে দশহরা, দশমী তিথিতে গঙ্গাস্নান, অগ্রহায়ন মাসের শুক্লা পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে নবান্ন অনুষ্ঠান এবং চৈত্র মাসের শ্রী শ্রী কৃষ্ণের দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর নবান্ন অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ভক্ত বৃন্দের সমাগম ঘটে এই আশ্রমটিতে।

আশ্রমের ঐতিহ্য বটবৃক্ষ। বটবৃক্ষের পাদ মুলে শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাই পরান চাঁদ ও মোহন চাঁদ নামের দুই শিষ্যকে নিয়ে অবস্থান করেছিলেন। এই বৃক্ষের নিচে কোন বন্ধ্যা রমনী যদি গঙ্গা সাগর থেকে ¯œান করে এসে এক মনে আচল বিছায়ে গোসাইজীর চরনে কান্নাকাটি করে আর গোসাইজী যদি তুষ্ঠ হন তাহলে ঐ বৃক্ষ থেকে তার আচলের উপর ফল পড়বে। তাহলেই সে রমনী সন্তান লাভ করবে। এ প্রচলন এখনও আছে। এই বৃক্ষ থেকে ফল পড়ে অনেক রমনী সন্তান লাভ করেছেন এমনটা মনে করেন তার ভক্তরা। প্রতি বছরের নবান্ন অনুষ্ঠানে এমন ভক্তের আগমন ঘটে।

পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তিন শতাব্দির স্মৃতিবাহী লালপুরের শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাই আশ্রম রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের কোলাহলে মুখরিত আশ্রম দিন দিন জনমানবহীন নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভবনের অংশ ও দেয়াল খসে খসে পড়ছে। ফাটল ধরেছে ছাদ, দেয়াল আর মেঝেতে। অন্য দিকে প্রভাবশালী মহল জমিজমা ভোগ দখল করছে। এমতাবস্থায় ইতিহাসের নিদর্শন লালপুরের বৈষ্ণব আশ্রমটি রক্ষার্থে সংশ্লি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি প্রয়োজন।

এলাকার সুধী মহল মনে করেন যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শ্রী শ্রী ফকির চাঁদ গোসাইজীর আশ্রম সংস্কার ও রক্ষা করা হলে অসংখ্য সনাতন ধম্বালম্বী সহ সব ধরনের মানুষের কাছে এটি হতে পারে আকর্ষনীয় বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র। আশ্রমটি রক্ষিত হলে প্রত্নতত্ত্বের প্রাচীন ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে থাকবে।