আসল আমেরিকানদের দেশে

American

টেক ট্রাভেল ডেস্কঃ  আসলে আমেরিকান কারা? কারা এই দেশটাকে নিজের বলে দাবী করতে পারে? সাইবেরিয়া থেকে আগত রেড ইন্ডিয়ানরা প্রায় ১৫/২০ হাজার বছরে ছড়িয়ে যেয়ে বসতি গাড়লো প্রেইরী থেকে প্যাটাগোনিয়ায়, তারপর আসলো ভাইকিংরা কানাডায় কিন্তু বসতি গাড়লো না, এরপর কলম্বাসের পিছু পিছু শ্বেতাঙ্গ মিছিল, মেরে কেটে খুলির চামড়া সহ চুল কেটে সমূলে বিলুপ্ত করার চেষ্টা করা হলো সব ধরনের মোহিকানদের। এরও পরে দাস হিসেবে আনা হল আফ্রিকানদের যাদের বংশধরদের এখন বলা হয় আফ্রো-আমেরিকান বা আফ্রিকান-আমেরিকান।

তারও শত বছর পরে আমেরিকায় নতুন নতুন মানুষের ভাগ্য বদলানোর আশায় আসা চলতেই থাকলো, এখন পৃথিবীর ধনী দেশ বলে পরিচিত নরওয়ে সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যাণ্ড, ইটালি সবখান থেকেই মানুষের ভীড় স্বপ্নরাজ্য অভিমুখে। আর হ্যাঁ, আরো কয়েক দশক পরে এই অর্থনৈতিক ভাবে ধনী দেশে আশা শুরু করেছে চীন, ভারত, বাংলাদেশ সহ সারা ল্যাতিন আমেরিকার, আফ্রিকার লোকেরা। মানে যুগে যুগে কালে কালে এখানে মানুষ এসেছে এবং আসছে, থেকে গেছে জীবিক ও জীবনের তাগিদে।

এখন কোন শ্বেতাঙ্গ যদি দাবী করে এটা শুধু তাদেরই দেশ এবং বাকীরা উড়ে আসা অনাহুত আগন্তক, তাদের কী বলা যায়? ‘মাথামোটা ট্রাম্পভক্ত’ নাকি অন্য কিছু? বাসার কাছেই অপূর্ব ভালুক-পর্বত (Bear Mountain), সবুজের বান পাহাড়ের ঢালে ঢালে, যদিও শরতে তার শোভা আরো মোহনীয় ঝিলমিল, তারপরও এখন নেহাতই কম নয়। সেই পাহাড়শ্রেণীর সবচেয়ে উঁচু স্থানে এক বাতিঘরের মতো ‘ওয়াচ টাওয়ার’ যার নাম আমেরিকান এক রাষ্ট্রপতির নামে, যিনি এই এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার পিছনে অন্যতম মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। সবুজে ছাওয়া পাহাড়, আর নিচেই রূপালি ফিতার মত হাডসন নদী, যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধুই স্নিগ্ধতা। বারেক ফিরে শুধু একবার দেখলেই হয় না, তৃষিত চাতকের মতো তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে, সেই যে ওস্তাদ প্রকৃতি সংরক্ষণবিদ জন মিউর জানিয়েছিলেন, ” We can never have enough of nature.”

টাওয়ারে ওঠার তিন মিনিটের মধ্যেই হরিণ দেখা গেলো! হরিণ ছানা, শরীরে সাদা সাদা ফোটার ছড়রা, সুন্দরবনের চিত্রল হরিণের মতো। এর মাঝেই কয়েকবারই পূর্ণবয়স্ক হরিণ দেখা হয়েছে- মধ্য রাতে গাড়ীর হেড লাইট, বিকেলে পার্কে হাঁটতে যেয়ে, কিন্তু গায়ে এমন সাদা সাদা বিন্দু বিন্দু ছিলো না তাদের, পরে বই দেখে জেনে নিতে হবে যে শিশুকালেই শুধু এদের এমন রূপ থাকে কিনা!

অনেক বাচ্চা দেখলাম টাওয়ারে, বাবা-মা নিয়ে এসেছেন তাদের প্রকৃতির কাছে, টেলিস্কোপে সিকি ডলার দিয়ে দূরের জিনিস কাছে এনে দেখানোর পাশাপাশি কাছের ফুল, প্রজাপতিও চেনাচ্ছেন দেখলাম। আসলেই নিসর্গ নিয়ে মুগ্ধতা, সচেতনতা, ভালোবাসা অতি শৈশবেই শুরু হওয়া দরকার।

হাডসন নদীর বুকে মেঘের ছায়া ভেসে যাচ্ছে তখন, আমরা নেমে পুরাই হিমবাহ-হ্রদের মতো নয়মাভিরাম সুনীল জলের হেসিয়ান হ্রদ দেখতে। বিয়ার মাউন্টেইন স্টেট পার্কের ভিতরে এক ঐতিহাসিক সরাইখানা আছে Bear mountain Inn নামে, তা এই হ্রদের পাড়েই।অবস্থিত। এক টুকরো ঝকঝকে নীলাকাশ যেন পড়ে রয়েছে আলগোছে পাহাড়ের পাদদেশে, কিন্তু সেখানো সাতরানো নিষেধ। গুচ্ছের মানুষ এসেছে সেখানে পিকনিক করতে অবশ্য এই আবহাওয়ায় যদি এখানে না আসে, তো আর আসবে কখন!

পার্কের নানা কোণে কাঠের সুদৃশ্য বেঞ্চ বসানো, তাদের সবগুলোয় গায়েই ধাতব ফলকে এই বেঞ্চগুলো কাদের অর্থায়নে নির্মিত তা খোদাই করা আছে, কয়েক হাজার ডলার লাগে এমন একটি বেঞ্চ নিজের বা কারো নামে স্থাপন করতে। বেশ ভালো লাগলো ব্যবস্থাটা, হয়তো যার নাম লেখা, তিনি এমনই কোন বেঞ্চে বসে দু’চোখ ভরে পৃথিবীকে ভালোবাসতেন এই ভালুক-পর্বত আর হেসিয়ান হ্রদের মাধ্যমে। নিজের নাম অব্যয় করে রাখতে পারবে না কেউই মহাকালে, কিন্তু ক্ষণিকের অতিথি হিসেবে এই ক্ষণস্থায়ী প্রচেষ্টা মন্দ নয়।

আমরাও বসলাম জলকিনারা ঘেঁষে এক জায়গায়, যেখানে মিনিট তিনেকের মধ্যে এসে লেজ তুলে গান গাওয়া শুরু করলো এক ‘মকিং বার্ড’। আগের রাতেই আমরা হারপার লী’র অবিস্মরণীয় উপন্যাস ‘টু কিল এ মকিং বার্ড’ এর কথা আলোচনা করছিলাম, কালো মানুষের বাঁচার অধিকার নিয়ে এর চেয়ে তীব্র সাড়া আর কোন উপন্যাস ফেলেছিলো কি? ভাইয়া মজা করে বললেন, ‘ দেখো দেখো, পাখিপ্রেমীদের দেখেই পাখি এত কাছে এসে মনের সুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ও তোমাদের চিনতে পেরেছে’।

তারপর আমাদের অন্য গন্তব্যের দিকে যাত্রার পালা, কথা ছিল ‘অ্যামিশ’ সম্প্রদায়ের মানুষের গ্রামে থাকব আজ রাতে পেনসালভ্যানিয়ায়, যেখানে বিদ্যুৎবাতির বদলে স্নিগ্ধতা ছড়ায় টিমটিমে লন্ঠন, গাড়ীর বদলে রাস্তা জুড়ে থাকে ঘোড়ার ব্যাগিগাড়ী, কিন্তু এক অনিবার্য কারণবশত যাত্রাপথ বদলে যেতে হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির দিকে ( ডিসি মানে ডিসট্রিক্ট অফ কলম্বিয়া)।

আমেরিকা নিয়ে যে ক’জন বাঙালি লেখকের ভ্রমণকাহিনী পড়েছি সে হোক সুনীল, হুমায়ূন না সমরেশ, সবখানেই এই গ্রে হাউন্ডে যাত্রার বিবরণ, তাই অস্বীকার করবো না যে এই যাত্রার অভিজ্ঞতাও চাইছিলাম চুপে চুপে।

বাস ষ্টেশনের ওয়াশ রুমে জলবিয়োগে হালকা হবার জন্য যেতেই দেখি পাশাপাশি শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, হলদে বর্ণের মানুষ নিজের কাজেই ব্যস্ত। দেখেই মনে হয়ে গেল নাসায় একসময়ে কর্মরত ৩ কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অবদান নিয়ে নির্মিত অসাধারন চলচ্চিত্র ‘Hidden figures’ এর কথা, যখন নাসায় শ্বেতাঙ্গদের টয়লেটে অন্যদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো, যখন ‘Colored Toilet’ লেখা ওয়াশরুম ছিলো না সকল ভবনে, ফলে অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে হতো তাদের।

হে আমেরিকা, তোমার সন্তানরা কী জানে তাদের আসল ইতিহাসের কথা?