ইতালী-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ৪

ITTA4

সকালের মিষ্টি ঘুমটাকে আজ একটু প্রশ্রয় দিলাম। দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা নেই। ভেনিস শহরের চরিত্র বোঝার চেষ্টা করবো আজ পায়ে হেঁটে। পেট পুরে নাস্তা খেয়ে ওয়াটার-ট্যাক্সী ডেকে বেড়িয়ে পড়লাম। বেশ খরচ এই জলবাহনগুলোতে। ১৫ মিনিটের পথ যেতে আমাদের টাকায় প্রায় ৬,৫০০ গুণতে হয়। বাংলাদেশের মাঝিরা যদি এটা জানতে পারতো, তা’হলে বোধহয় সব সখীরে পাড় করিতে আর “আনা-আনা” নিত না! এই ওয়াটার-ট্যাক্সীগুলোতে মিটার আছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের সিএনজি-দের মত সেগুলো শুধুই থাকতে হয় তাই আছে। একেকটাতে জন দশেক বসতে পারে কাঁচের ছই দিয়ে ঢাকা এই ট্যাক্সীতে। ইঞ্জিন থাকায় বেশ জোরেই চলে এ নৌকাগুলো।

সেন্ট মার্কো চকের জেটিতে আমাদের ট্যাক্সী এসে ভিড়লো। আগেই বলেছি, এই চকই শহরের কেন্দ্রবিন্দু। আবহাওয়া বেশ ভালো থাকায় বেশ লোকজনের সমাগম হয়েছে আজ। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য নানান ধরণের উপকরণ নিয়ে কিছুদূর পরপর ঠেলাগাড়ীতে দোকান বসিয়ে আছে হকাররা। তা’দের দোকানে আছে হরেক রকমের স্যুভেনিয়র, মাথার টুপি, দস্তানা, গায়ে দেয়ার শাল, স্কার্ফ, আরও কত কি! এদের পেড়িয়ে রাস্তা হাঁটাটা রীতিমত একটা হার্ডলস রেসের মত! এই হকারদের উপেক্ষা করাটা একটা চ্যালেঞ্জ বটে। পদে পদে থেমে কিছু একটা না নেড়েচেড়ে দেখে, একটু না দর কষাকষি করে এগিয়ে যাওয়াটা প্রায় দুঃসাধ্য। চ্যালেঞ্জে নতি স্বীকার করে টুকটাক প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় (পরেরটাই বেশী) জিনিস ব্যাগে পুরে এগিয়ে চললাম।

বিদেশে আসলে কেন যেন কিছুক্ষণ পরপরই খিদে পায়। হাওয়া বদলের কারণে হয়তো! তা’ছাড়া আমার আবার নতুন নতুন খাবার আর ভাল রেস্তোঁরার ব্যাপারের একটু দুর্বলতা তো আছেই। ভেনিসের এই সেন্ট মার্কস স্কোয়ারে খ্যাতনামা একটি ভোজনালয় রয়েছে। ‘কোয়াড্রি’ নামের এই রেস্তোঁরাটি মিশেলিন তারকা জয়ী। বিশ্বব্যাপী ভাল ভাল রেস্তোঁরাকে মিশেলিন কোম্পানী যাচাই-বাছাই করে এই তারকা দিয়ে সম্বর্ধিত করে থাকে। ‘কোয়াড্রি’-র ভেতরটা দেখে তো মুখ হা হয়ে গেল। রাজপ্রাসাদের মত অন্তর্সজ্জা এখানে। চেয়ার-টেবিল, দেওয়াল-ছাদ, ঝাড়বাতি সবটাতেই মনে হচ্ছিল হাজার বছরের বনেদীআনার রেশ রয়েছে। ম্যানেজার সাহেব নিজেই আপ্যায়ন করে বসালেন আমাদের। এরপর দিতে শুরু করলেন খাবারের ফিরিস্তি। মাফ করবেন, ইতালীয় নামগুলো মনে রাখতে পারিনি বলে। তবে এটুকু বলতে পারি, চিংড়ীমাছ, ভেটকি মাছ, গরুর মাংস, কোয়েল পাখী, পালং শাক, বেগুন আর গাজর-টমেটো দিয়ে বিশ্বজয় করা ষড়পদ পরিবেশন করে আমাদের মন জয় করে ফেলেছিলেন কোয়াড্রি-র তারকা শেফ।

ভেনিসের সাথে সমার্থক গণ্ডোলা নৌকা। প্রায় ১১ মিটার লম্বা আর সাড়ে চার ফুট চওড়া আনুমানিক ৩৫০ কেজি ওজনের এই নৌকা চালায় একজন গণ্ডোলিয়ার। ভেনিসে এসে গণ্ডোলায় না চড়লে জীবনই বৃথা। কিন্তু তা’তো আর হতে দেওয়া যায়না! তাই, গণ্ডোলা-ঘাটে গিয়ে গণ্ডোলিয়ার মাঝিদের সাথে দামাদামি শুরু করলাম। রিক্সা-স্ট্যান্ডে যখন অনেকগুলো রিক্সা থাকে, তখন যেমন সবচেয়ে নতুনটাতে চড়তে ইচ্ছে করে, সেরকম সবচাইতে চকচকে গণ্ডোলাটায় উঠে পড়লাম। ডোরাকাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়; আর ডোরাকাটা গেঞ্জী দেখে গণ্ডোলিয়ার চেনা যায়! এই মাঝিরা ঐতিহ্যগতভাবে মোটা ডোরাকাটা ফুলহাতা গেঞ্জী আর দুই-ফিতেওয়ালা খড়ের টুপি পরে দাঁড় বাইতে বাইতে রোমান্টিক গান ধরে, আর ভেনিসের ছোট ছোট খালে ঘুরে বেড়ায়। ২০ মিনিটের সওয়ারী ১,২০০ টাকায় শেষ করে পকেট হালকা হলো বটে, কিন্তু মনটা গেল ভরে। ছোটবেলায় বাবা-মার কাছে তাঁদের গণ্ডোলা-ভ্রমণের কথা শুনেছি। পরবর্তীতে ১৯৭৯ সালের ‘দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চন-জীনাত আমানের ওপর ভেনিসে চিত্রায়িত আশা ভোঁশলের গাওয়া গানের ভিডিওটা যে কতবার দেখেছি তার হিসেব নেই! আজ নিজে সেই গণ্ডোলা-ভ্রমণ করে বেশ খুশী খুশী লাগছিল।

সন্ধ্যেবেলা স্থানীয় এক বন্ধুর সাথে দেখা হবে। তা’কে নিয়ে সান্ধ্যভোজনে যাবো। সে অভিজ্ঞতার কথা জানাবো পরের পর্বে। হোটেলে ফিরে আরও এক পরত গরম জামা চড়াতে হবে গায়ে। রাতে পারদ নামবে ২ ডিগ্রীর কোঠায়। ওয়াটার-ট্যাক্সী ঘাটে ভিড়েছে। সাবধানে পাটাতনে পা ফেলে উঠতে হবে। ল্যাপটপ বন্ধ করতেই হচ্ছে। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।