উত্তর-মেরু যাত্রীর ডায়েরী–পর্ব ১

Uttar

সৈয়দ আলমাস কবীর : বিশালাকার ৩৮০-৮০০ আমিরাতী বিমানে চড়ে বাসরা, বাগদাদ, মসুল, আঙ্কারা পেরিয়ে কৃষ্ণসাগরের উপর দিয়ে ৩৮,০০০ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ে চলেছি ডেনমার্কের রাজধানীর উদ্দেশ্যে। গতকাল মধ্যরাতে ঢাকা থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যমণি দুবাইতে এসে পৌঁছেছিলাম। বিমানবন্দরের ভেতরেই অবস্থিত হোটেলে রাত্রিযাপন করে আজ সকালে শুরু করলাম আমাদের যাত্রার দ্বিতীয় অধ্যায়। দুবাইয়ের বিমানবন্দর হোটেলটি আর যেকোন তিন-তারকা হোটেলের মতই।

বেশ বড় কামরায় টেলিভিশন, ফ্রীজ, ইস্ত্রি, লকার সবই ছিল। নরম বিছানায় গা এলিয়ে দিতে না দিতেই যত রাজ্যের ঘুম এসে আষ্টেপৃষ্টে ধরেছিল। ভাগ্যিস্‌ ঘুম-ভাঙানোর স্বয়ংক্রিয় সংকেত-ব্যবস্থাটা করে রেখেছিলাম, না হলে ভোর সাড়ে ছ’টায় কখনই উঠতে পারতাম না! ট্রেনে চেপে অন্য টার্মিনালে গিয়ে বিমানে চড়তে হয়েছিল আমাদের। অবশ্য এর মধ্যেই লাউঞ্জে গিয়ে প্রাতঃরাশটা সেরে নিয়েছিলাম তাড়াহুড়ো করে। কাল রাতে যখন নেমেছিলাম, সারা বিমানবন্দরটা কেমন যেন খা খা করছিল। দুবাইয়ের এই জনপ্রিয় অতিক্রমণস্থলটি সাধারণতঃ দিনরাত লোকে গমগম করে। হরেক রকমের নামীদামী দোকানপাটে ভরা এই বিমানবন্দরটি যেকোন আধুনিক শপিংমলের সাথে পাল্লা দিতে পারে। ঘড়ি, সোনার গয়না থেকে শুরু করে কাপড়চোপড়, চকোলেট সবই পাওয়া যায় এখানে। ভাগ্যদেবী প্রসন্ন হলে লটারীতে দামী গাড়ীও জিতে যেতে পারেন এখান থেকে।

 অবশ্য সেই গাড়ী নিয়ে দেশে কী করে ফিরবেন, সেটা অন্য কথা! তো সেই লোকপ্রিয় বাজারস্থল তথা বিমানবন্দরের এই লোকহীন হাল কী করে হলো চিন্তা করতেই পাশ থেকে একদল মুখোশ-পরা ইউরোপীয় যাত্রী হেঁটে চলে গেলেন। বুঝলাম করোনা-ভাইরাস আতঙ্কের অবদান এটি। মাস তিনেক আগে চীনের ভূহান প্রদেশে এই নতুন প্রজাতির ভাইরাসের ‘উৎপত্তি’ হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত আট-শতাধিক জীবনহানির খবর পাওয়া গেছে। ফলে বিশ্বব্যাপী জনসাধারণের মধ্যে একটা ব্যাপক ভীতির সঞ্চার হয়েছে। বিমানভমণও কমে গেছে তাই উল্লেখযোগ্যভাবে। আমার কেন জানি মাঝেমাঝে মনে হয়, এসব নতুন নতুন ভাইরাস মানুষেরই তৈরী। কখনও ওষুধ কোম্পানীগুলোর প্ররোচনায়, আবার কখনও বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে গোপন গবেষণাগারে জৈব-অস্ত্র হিসেবে তৈরী করা হয় এসব জীবাণু। কখনও ইছাকৃত ভাবে ছড়ানো হয় সেগুলো, আবার কখনও বা ভুলবশতঃ কিংবা দুর্ঘটনাবশতঃ ছড়িয়ে পড়ে কৃত্তিম উপায়ে তৈরী এসব ভাইরাস। কে জানে, হয়তো বা এসব ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব পুরোটাই আমার কল্পনা, বেশীমাত্রায় হলিউডের সিনেমা দেখার ফসল!

উত্তর-মেরুর যাত্রাপথটা কয়েকটি ভাগে ভাগ করে নিয়েছি আমরা। দুবাইয়ে প্রথম যাত্রা-বিরতির পর কোপেনহাগেন; সেখানে একরাত কাটিয়ে অস্‌লো; তারপর সেখান থেকে নরওয়ের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত ট্রমসৌ শহর। এই ট্রমসৌ আর্ক্টিক সার্কেল বা সুমেরু-বৃত্তে অবস্থিত। সুমেরুর কেন্দ্রবিন্দুটি উত্তর মহাসাগরের মধ্যিখানে; জাহাজে চেপে সেখানেও যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। মেরু মানেই বরফ, আর বরফ মানেই ঠাণ্ডা! সেই ছোটবেলা থেকে সারা শরীর ঢাকা মোটা কাপড় আর পশমের টুপি পড়া গ্রীণল্যাণ্ডের এস্কিমোদের ছবি দেখে এসেছি। আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেটা সেই গ্রীণল্যাণ্ডেরও উত্তরে। দু’ স্যুটকেস বোঝাই করে যদিও শীতের মোটা কাপড় নিয়েছি সঙ্গে, তবুও মেরুর শীত তা’তে সামাল দিতে পারবো কি না বলা মুস্কিল!

আমাদের বিমানে একটি আলাদা বৈঠকখানা ও পানশালা রয়েছে। সাত-ঘন্টার যাত্রাপথে নিজের সীটে বন্দি হয়ে বসে না থেকে যাত্রীরা যাতে সেখানে গিয়ে একটু হাত-পা ছড়াতে পারেন, সে জন্যই এ ব্যবস্থা। এক ড্যানিশ ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হলো সেখানে। কোপেনহাগেন-এ কোথায় কোথায় যাওয়া যায়, এমন কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গার নাম বলে দিলেন তিনি। আমি আগে বার দু’য়েক সেখানে গিয়েছি, কিন্তু প্রতিবারেই মিটিং আর কাজে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে, খুব বেশী শহরটাকে ঘুরে দেখার সুযোগ পাইনি। এবার একেবারেই আনন্দভ্রমণ, কাজকামের বালাই নেই। তাই ভাইকিংদের এই শহরটকে কেঁচে গণ্ডূষ করতে হবে এ দফা!

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।