প্যারী-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ১

Pari Tour 1

সৈয়দ আলমাস কবীর: বিদেশ-মন্ত্রী হঠাৎ করেই বললেন, আগামী সপ্তাহে প্যারী চলুন আমার সাথে। ফরাসী সাংসদদের সাথে সভা আছে, সেখানে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরে তাঁদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এদেশে বিনিয়োগ করার জন্য। বোঝাতে হবে, এদেশে এসে ব্যবসায় করলে তাঁদের যারপরনাই লাভ হবে। ঢাকায় একটি পুরস্কার-বিতরণী অনুষ্ঠানে দেখা হয়ে যাওয়ার পর মন্ত্রী মহোদয়ের এই হঠাৎ আমন্ত্রণ। ব্যস্ততা দেখিয়ে একটু পাশ কাটাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মহোদয় নাছোড়বান্দা! অগত্যা দেড়দিনের সফরে বেরিয়ে পরলাম ফরাসী দেশের রাজধানী প্যারী শহরের উদ্দেশ্যে।

ঢাকা থেকে দুবাই হয়ে প্যারী। এমিরেট্‌স বিমানের আতিথেয়তা বিশ্বখ্যাত। আদরযত্নের কমতি নেই এদের। কতরাজ্যের খাওয়া-দাওয়া আর পানীয় যে এদের হেঁশেলে জমা রয়েছে, ভাবতেও অবাক লাগে। সকালে রওয়ানা করলেও, আকাশে ওড়ার কিছু বাদেই ওরা মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করলো। এমিরেট্‌স-এর বিমানে যাত্রী পরিচর্যায় হরেক জাতির কর্মীরা কাজ করেন। দুবাই আকাশপথের একটা আবশ্যিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়াতে বহুজাতিক কর্মী-বাহিনীও অপরিহার্য্য। প্রতিটি ফ্লাইটেই অন্ততঃ ৫/৬ রকম ভাষা জানা কর্মী থেকে থাকেন। তাঁদের যত্ন-আত্তিতে মুগ্ধ হয়ে দুবাইতে অবতরণ করলাম।

লে-ওভারের সময় ঘন্টা দেড়েক হলেও সুবিশাল দুবাই বিমানবন্দরে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে সময় লেগে যায় অনেক। আমি যে টার্মিনালে নামলাম, প্যারীর বিমান সেখান থেকে ছাড়বে না। ট্রেনে করে সঠিক টার্মিনালে যখন পৌঁছুলাম, তখন খুব বেশী সময় হাতে নেই। এদিকে পেটে চাপও জমেছে খানিকটা। একটা বাথরুম পেলে মন্দ হয় না। আশেপাশে জমকালো সব শুল্কমুক্ত দোকানপাট। এগুলো উপেক্ষা করে আবার বিমানে আরোহণের ব্যাপারটাও ঠিক জমবে না আমার। অন্তরবর্তীকালীন বিমানবন্দরগুলোতে এসব শুল্কমুক্ত বিপণীগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে আমার বেশ লাগে। লম্বা যাত্রার একঘেয়েমিটা কেটে যায় খানিকটা। কিন্তু এবেলা বোধহয় সেটি হচ্ছে না। কারণ হাতে যা সময় রয়েছে, তা’তে হয় বিপণীবিতান, না হয় শৌচালয়। মনে মনে ভাবলাম, পানি দিয়ে প্রক্ষালনের এ-ই শেষ উপায়! এরপর তো ইউরোপে পৌঁছে কাগজ দিয়ে মোছামোছি করতে হবে! অতঃপর মনভোলানো বিপণী ভুলে নিজেকে শুচি করারই সিদ্ধান্ত নিলাম। পানির স্প্রের প্রচলন হওয়ার পরও পশ্চিমারা আর কেন কাগজ ব্যবহার করে, তা’ আমার বোধগম্য হয় না। সাদা চামড়ার পরিষ্কার চেহারার মানুষগুলোর অন্তর্বাসে ময়লা লেগে থাকাটা একটা আয়রণি বৈকি! এরা যতই ‘পেপারলেস অফিস’ বলে চিল্লাক না কেন, এদের বাথরুমটা অন্ততঃ কোনদিনই পেপারলেস হবে না!

প্যারী-গামী বিমানটি ফরাসীদের তৈরী একটি এয়ারবাস ৩৮০-৮০০ – এভিয়েশন ইণ্ডাস্ট্রির সর্ববৃহৎ যাত্রীবাহী বিমান। দো’তলা এই অতিকায় বিমানটি কি করে প্রায় সাড়ে পাঁচশ’ যাত্রী নিয়ে অনায়াশে আকাশে ওড়ে, তা’ ভাবতেও অবাক লাগে। রাইট ব্রাদার্সের বানানো সেই রাইট ফ্লাইয়ার থেকে মাত্র একশ’ বছরে বিমান-প্রযুক্তির এই পরিবর্তন রূপকথার গল্পের মত। এর চার-চারটি মিনিবাস-সম বিশাল ইঞ্জিনের একেকটা ৭০ হাজার পাউণ্ড পরিমাণ ধাক্কা দিতে পারে। সেই ধাক্কায় হাওয়ায় ভেসে বায়ুবিদ্যার বাহাদুরী প্রদর্শন করে আর মাধ্যাকর্ষণকে কাঁচকলা দেখিয়ে ৪০ হাজার ফুট উঁচুতে উড়ে মহাদেশ-মহাসাগর পাড়ি দেয় এই ফরাসী বিমান। প্রথম-শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য গোসলখানা, আর ব্যবসায়-শ্রেণীর জন্য আলাদা বৈঠকখানা রয়েছে এই বিমানে। নিয়মিত যে খাবার-দাবার পরিবেশিত হয়, সেটা ছাড়াও যদি কারও খিদে পায় বা তেষ্টা লাগে, অথবা স্রেফ হাত-পা ছড়ানোর জন্য যাত্রীরা বৈঠকখানায় এসে বসতে পারেন। বার-সেবক বা সহযাত্রীদের সাথে গল্পগুজব করতে পারেন। আকাশ-পর্যটনে চূড়ান্ত বিলাসিতা এই এয়ারবাসে মেলে।

প্যারীতে পৌঁছানোর কথা রাতে। সেখান থেকে হোটেল ঘন্টা-খানেকের পথ। এবেলা একটু জিরিয়ে নেই। বাকী কথা পরের পর্বে লিখবো। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।