পাবনা বেড়ার জমিদার বাড়ির ভগ্নদশা

jomidar bari

কালের গর্ভে তের জমিদারের ইতিহাস

 

অলোক আচার্য, পাবনা প্রতিনিধিঃ জমিদার বাড়ি নামটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশাল অট্রালিকা।  অট্রালিকার সামনে বেশিরভাগক্ষেত্রেই একটি শান বাধানো পুকুর, বাড়ির প্রবেশমুখে বাঘ বা সিংহের পাথরের মুর্তি বসানো।  আর জমিদার হলেন দামী কাপড়ে আগাগোড়া মোড়া একজন সুদর্শন ব্যক্তি।  যার সারা গায়ে মণি মানিক্য ছড়ানো থাকে।  জমিদার আর জমিদার বাড়ি সম্পর্কে মানুষের মনে যে ছবি আছে তা অনেকটা এরকমই। বিপরীতে প্রজা বাৎসল্য জমিদারেরও সাক্ষাৎ পাওয়া যায় ইতিহাসে। তবে সেই দুচার জন বাদ দিলে জমিদারদের আচরণ সম্পর্কে যেটুকু প্রচলিত আছে তা নিষ্ঠুর আচরণ আর নির্মমতার প্রতীক।  ব্রিটিশদের বাংলাকে শোষণ করার সুবিধার্থে বাংলার কিছু ধনী মানুষের হাতে গরীব প্রজার ভাগ্য ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে মাসের পর মাস খাজনা আদায় করার জন্য জমিদার শ্রেণি সৃষ্টি করা হয়।  অধিকাংশ জমিদারই ব্রিটিশদের সেই হিংস্র মনোস্কামনা কড়ায় গন্ডায় পূরণ করেছিল।  সে ইতিহাস কলংকিত।  সে ইতিহাস নিষ্ঠুরতার।  দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এসব কালের স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকে জমিদার বাড়ি।  এসবের অনেকগুলোই আজ দর্শনার্থীদের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে।  আবার কালের পরিক্রমায় অনেক জমিদার বাড়িই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাড়িয়ে আছে।

পাবনার বেড়া উপজেলার বিখ্যাত তের জমিদার বাড়ি কালের পরিক্রমায় আজ ভগ্নদশায় উপনীত হয়েছে। বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া গ্রামে এই জমিদারির গল্প আজও লোকমুখে গল্পের মত ঘোরে। জমিদারির পাইক পেয়াদার কথা, গানের আসরের কথা, পাশেই যমুনা নদীতে রাজাদের প্রমোদ তরীর কথা এসব আজ মানুষের মুখে কেবল গল্প।  একসময় এ গ্রামে তের জন জমিদার বাস করতো।  তাই এই গ্রাম তের জমিদারদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত।  তবে এই তের জমিদারের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা।  বর্তমানে ভাঙাচোরা পলেস্তরা খসা দালান আর কয়েকটি পুকুর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। গ্রামটি উপজেলা শহর থেকে একটু ভেতরে হওয়ায় গ্রামটির অবস্থাও তেমন সুবিধা জনক নয়।  সবমিলিয়ে জমিদারদের এই গ্রাম  আজ অনেকটাই উপেক্ষিত।  এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে একসময় ব্যবসা বাণিজ্যেও অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই হাটুরিয়া গ্রাম। বড় বড় বণিকরা বাস করতো এ অঞ্চলে।  গ্রামের পার্শবর্তী বাণিজ্যকেন্দ্র নাকালিয়ার সাথে কলকাতার নৌপথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল।

একশ বছর আগে এ গ্রামে দুই একজন জমিদারের বাস ছিল।  পরে এখানে জমিদারদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।  একসময় এ সংখ্যা দাড়ায় তেরোতে।  তের জন জমিদার হলো প্রমথনাথ বাগচী, কাঞ্চীনাথ বাগচী,উপেন্দ্রনাথ বাগচী,ভবানীচরণ বাগচী,কালী সুন্দর রায়,ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়,সুরেন চন্দ্র রায়,সুধাংশু মোহন রায়,শক্তিনাথ রায়,বঙ্কিম রায়,ক্ষুদিরাম পাল,যদুনাথ ভৌমিক ও যতীন্দ্রনাথ ভৌমিক।  এলাকার প্রবীণ ব্যাক্তিদের মতে এসব জমিদারদের বসবাসের সময়কাল ছিল আনুমানিক ১৯১৫ সাল বা এর পর থেকে।  জমিদারি প্রথা বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা এ গ্রামেই জমিদারি পরিচালনা করতেন।  হাঁটুরিয়া গ্রামের জমিদারের কথা উঠলেই লোকমান পেয়াদার কথা ওঠে।  সে সময়কার একমাত্র স্বাক্ষী ছিলেন এই লোকমান পেয়াদা। জমিদার প্রমথনাথ বাগচীর পেয়াদা ছিলেন তিনি। তার বাবা-দাদাও জমিদারের পেয়াদা ছিলেন। তার মুখ থেকে শোনা কাহিনীতে প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৩ জমিদারের মধ্যে সবচেয়ে প্রজাবৎসল ছিলেন প্রমথনাথ বাগচী।  আর প্রজা পীড়ক ছিলেন যদুনাথ ভৌমিক।  এক গ্রামে এত জমিদার থাকলেও তাদের মধ্যে কখনো দ্বন্দ্ব সংঘাত হতো না। বরং বিভিন্ন পূজা পার্বণে সবাই মিলে মিশে উৎসব পালন করতো।  জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির হওয়ার পর দেশ ভাগের আগে পরে একে একে সবাই স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে যান।  জমিদারদের প্রত্যেকেই বাস করতেন প্রাচীরঘেরা অট্রালিকায়।  অট্রালিকার পাশেই ছিল শান বাঁধানো ঘাট।  সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে বেশিরভাগ পুকুরই ভরাট হয়ে গেছে।  যে কয়েকটি অবশিষ্ট রয়েছে তার অবস্থাও করুণ।  একই রকম অবস্থা বড় বড় অট্রালিকাগুলোর।  মালিকানা বদলের পর কিছু অট্রালিকা ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিছু কিছু যত্নের অভাবে ভেঙে গেছে।  সাক্ষী হিসেবে গ্রামে এখনও দু-তিনটি অট্রালিকার ভগ্নাবশেষ আজও রয়ে গেছে।  জরাজীর্ণ এসব অট্রালিকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন কয়েকটি পরিবার।  এমনি একটি পরিবার দ্বিতল অট্রালিকায় বসবাস করা দিলীপ গোস্বামীর পরিবার।  অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ইজারা নিয়ে তারা বসবাস করছেন।  দিলীপ গোস্বামীর ছেলে দীপক গোস্বামী জানান, অট্রালিকার এক স্থানে এর নির্মাণকাল ১৯১১ সাল এবং নির্মাতা হিসেবে জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের বাবা উমেশ চন্দ্র রায়ের নাম খোদাই করা ছিল।  তিনি ছেলেবেলায় এখানে সুপরিসর জলসাঘরসহ অনেক কক্ষ দেখেছেন।  হলরুমে ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষের ছবি ছিল।  জলসাঘরসহ সব কক্ষই জরাজীর্ণ।  ছবিগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে।  ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও তারা এখানে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।  হাটুরিয়া বাজরের সার ব্যবসায়ী বাবু বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ গ্রামটির সমস্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না।  ভাবতে অবাক লাগে ১৩ জমিদার বসবাস করা গ্রামটির আজ এই করুণ দশা।

গ্রামে বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করে হাঁটুরিয়া নাকালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সমস্যাগুলো সমাধানের পাশাপাশি বিলীন হতে বসা ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণের উদ্যেগ নেওয়া হবে।