হঠাৎ একদিন তাজপুরে

tajpur-tour3

বৈশাখী নার্গিস, ভারত প্রতিনিধিঃ সমুদ্রের ছায়ায় ছোট্ট হোটেলের শান্ত চাহনি, এক লহমায় আমাদের মন কেড়ে নিয়েছিল সেদিন। আমাদের ব্যালকনির সামনেই সমুদ্র সৈকত। পা গুনে গুনে ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাড়ে। হোটেলের ব্যালকনি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে সেই অসীম। হাতছানি দিয়ে যে ডাকে সারাক্ষণ। কাজের ফাঁকে, ঘুমের ভেতর আধো জাগরণে। ছোটবেলা থেকেই যেন কেউ পায়ে সরষে ঘষে দিয়েছিল। আর সে কারনেই নাওয়া খাওয়া ভুলে কেউ যদি শুধু ঘুরতে বলে। এক পায়ে খাড়া। এই তো জীবন, যাক না যেদিকে যেতে চায়। সেরকমই আর কি।

বন্ধুদের আড্ডায় সেদিন এমনি কথা হচ্ছিল অনেকদিন কোথাও সবাই মিলে যাওয়া হয়নি। এমনিতে অফিসের চাপে বিশেষ ঘোরা হয়ে ওঠে না। চান্স পেলে আমরাই বা ছাড়ব কেন। তাই শুক্রবার রাতে অফিস থেকে ফেরার পর ঠিক হল, এভাবেই বেরোবো। শনি, রবি ছুটি পাচ্ছি। তাই বেশি না ভেবেই হ্যাঁ বলে দিলাম। কোথায় যাব সেটা ঠিক করতে কেটে গেলো আরও আধ ঘন্টা। তারপর যা হয়। বাঙালির ওয়ান এন্ড অনলি ডেস্টিনেশন। তবে দীঘা নয় কিন্তু। সবাই জানে এটি একটি ভার্জিন সী বিচ। তবে দীঘার খুব কাছে নাম তাজপুর। নিরিবিলি, শান্ত এই সৈকতে আমাদের মতোই কিছু ভবঘুরে, উড়নচন্ডী মানুষরাই যায়। ঠিক হল ভোরবেলা বেরোব। বাসে করে এখান থেকে ৩ ঘন্টার জার্নি। হোটেল বুক করা হল সেই মতো। এখানে যেতে হলে আগে থেকে ঘর বুক না করলে সমস্যা। কারণ অধিকাংশ সময় বুকড হয়ে যায়। কম সংখ্যক হোটেল বলেই থাকার সমস্যা হয়। আমাদের লাক যে আমরা পেয়ে গেলাম। আমরা সাত জন যাব ঠিক করলাম।

ঠিক হল সকালবেলা ধর্মতলা থেকে বাস ধরব। তৌফিক বাস টিকিট বুক করে নিল। তনু, প্রণবেশ, অনীক, সৃজা, সায়ন্তী আর আমি। এই ক’জনের নাম সবার আগে। বাকিরা যাবে না বলে কেটে পড়ল। অগত্যা সেই হিসেবে রুমে ফিরে ব্যগে দু’দিনের জন্যে যা জামাকাপড় দরকার নিয়ে নিলাম। খাওয়ার খেয়ে মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করে যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়লাম।

tajpur-tour1

ভোর ৪টেয় আমার অ্যালার্ম বেজে উঠল। তারপর একে একে সবাইকে ফোন করে ঘুম থেকে তোলা। উফ সে যে কি জ্বালা। সকাল ৭টা ৩০-এ বাস ছাড়বে। অন্তত পক্ষে আধ ঘন্টা আগে তো পৌছতে হবে। ঘুম থেকে ওঠার ঝামেলা পেরিয়ে শেষমেশ পৌছনো গেলো আমাদের বাসের গেটে। তার আগে নিয়ে নেওয়া হল বিস্কিট, কেক, জল, ওষুধ।

এবার শুরু হল জানলার ধারের সিটে কে বসবে। সেই নিয়ে মারপিট।

ধর্মতলা থেকে তাজপুর ৩-৪ ঘন্টার জার্নি। তাছাড়া দক্ষিণ বঙ্গের বাস জার্নি প্রায় ঝামেলা-হুজ্জত বর্জিত। বিদ্যাসাগর সেতু ধরে আমাদের বাস এগিয়ে চলল কোলাঘাট পেরিয়ে এন এইচ ১১৬ ধরে। গানে আড্ডায় জমে উঠল আমাদের বাস জার্নি। যেহেতু জানলার ধারের সিট নিয়ে মারপিট। তাই পালা করে সবাই জানলার সিট পেলাম। সকাল ৭ টা ৩০এ বাসে চেপে ১২টায় আমরা বালিসাই পৌঁছলাম। সেখান থেকে টোটোয় চেপে রওনা দিলাম তাজপুরের উদ্দেশ্যে, মোটে ২০ মিনিটের পথ। মূল শহরের বাইরে খোলামেলা এই সমুদ্র সৈকতটিকে যেন আগলে রেখেছে এক মধুর অনুভূতি। কয়েক বছর হল এই জায়গাটাই টুরিস্টদের কাছে মুখ্য আকর্ষণ। পশ্চিমবঙ্গ সরকার হালে সমুদ্রের ধারে বিচ রিসর্ট বানিয়ে দিয়েছে, আমরা এসেছি এই তাজপুরেই থাকব বলে। টোটো আমাদের করে ভালো মতো পৌঁছে দিল রিসেপশন অবধি। এখানে আসবার পথে চারদিকের মনোরম পরিবেশ দেখে আমাদের উৎসাহের সীমা আরও বেড়ে গেলো। ছোট একটা নদী আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই চলল, যতক্ষণ আমরা হোটেলে পৌছইনি। উঁচু বাঁধ ধরে আমরা যখন সমুদ্রের কাছে ছুটে আসছিলাম। জলাভূমি আর মাছের ভেড়ির সোঁদা গন্ধ নাকে আসছিল। সেইসঙ্গে বাতাসে নোনা আবহ। এখনও শীত পড়েনি সেভাবে, তাই দুপুরে গরমই লাগছিল।

হোটেলে পৌঁছেই যে যার রুমে দৌড়ে গেলাম ফ্রেশ হয়ে এখুনি বেরোব সমুদ্রে বলে। যেন তর সইছে না প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার। হোটেলে লাঞ্চের জন্য বলে আমরা বেরোলাম সবাই। এখানে এসেও প্রণবেশ সমুদ্রে যাব না, যাব না করছিল। তার নাকি ঘুম পেয়েছে। অগত্যা তাকে রেখে আমরা একপ্রকার দৌড় লাগালাম সেখানে।

অক্টোবর মাসের শেষাশেষি ফলে এখানে ঠান্ডা এখনও পড়েনি সেভাবে। দীর্ঘ পথের জার্নির পর সামনে অতখানি ছড়ানো জল দেখে সেটা অত গায়ে মাখলাম না। একেবারে সমুদ্রের মুখোমুখি পরপর একতলা, দোতলা লাল টালির ছাদওলা সব কটেজ, আমাদেরটা দু’মিনিট হাঁটা পথের শেষ মাথায় ফলে এখান থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্যটা অনেক বেশি নিরিবিলিতে উপভোগ করা যায়।

অতঃপর সবাই মিলে সমুদ্র তীরে গিয়ে ঝাপটে পড়লাম। বহুযুগ পরে যেন প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা। হ্যাঁ এরকমই মনে হয় আমার। যতবার তাকে দেখি, তত কম মনে হয়। গুনগুনিয়ে গানও করতে শুরু করল তনু, “মাঝে মাঝে তব দেখা পাই… চীরদিন কেন পাই না…’’ বিচের দোকানপাট, ওয়াচ টাওয়ার, খুদে খুদে লোকজন, দূরে মাছ ধরার ট্রলার। সব মিলিয়ে এমন এক সুন্দর আবহ। এদিকে বাকিরা অর্ধেক জলে নেমে পড়েছে। আমি ওদের পাত্তা না দিয়ে বালিয়াড়ি, ঝাউবনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে জেলেদের ঝুপড়ি, নৌকো, মাছ ধরার জাল আর বড় রাস্তার দিকটায় সারি সারি খাবারের দোকান। বীচ জুড়ে লাল কাঁকড়া আর ঝিনুক। চুপি চুপি হাঁটতে গেলেই তাঁরা মাটির ভেতরে চলে যাচ্ছে। তনু আর আমি অনেক ঝিনুক কুড়িয়ে নিলাম। কোচড় ভরে। যেমনটা ছোটবেলা করতাম আর কি।

এখানে যেহেতু লোকজনের সংখ্যা কম, তাই নিশ্চুপ, নিঝুম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল এখন ৪টে। বেশ থ্রিলিং লাগছে। মনে হচ্ছে সব কিছু থেকে দূরে এই জায়গায় থেকে যেতে পারলে মন্দ হত না। আমার আবার মাঝে মাঝেই অনেক কিছু করতে ইচ্ছে করে। সেরকমই এখন যেমন জেলেদের মতো হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। সপ্তাহের শেষ। তার ওপর পুজোর মরশুম তাই প্রচুর লোক এসেছে সমুদ্র দেখতে, এদের বেশির ভাগই অল্প বয়সী ছাত্র-টাত্র। ফ্যামিলিও আছে তার মধ্যে। তবে খুব কম। এরকম অচেনা জায়গায় সাহসী পদক্ষেপ একমাত্র তারাই ফেলতে পারে, যাঁদের ভয় কম।

তাজপুরের প্রধান আকর্ষণ হল বিস্তীর্ন সমুদ্র সৈকত আর অপার নিস্তব্ধতা। সমুদ্রে স্নানের পর ফিরে এসে হাপুসহুপুস করে সবাই খেতে বসে গেলাম। হোটেলের খাওয়ার ভীষণ ভালো। পমফ্রেট, ভেটকি, চিংড়ি। উফ শেষ হয় না। ভোজন রসিকদের বেশ ভালোই লাগবে। শেষ পাতে আরও চমক ছিল। দারুন একটা আমের চাটনি মুখের মধ্যে যেন গলে গেলো। এতদিন পরও সেই চাটনির স্বাদ লেগে আছে মুখে। রুমে ফিরে সবাই খানিক জুড়িয়ে নিলাম।

সন্ধেবেলা হোটেলে চা খেয়ে আমরা সী বিচে হাঁটতে গেলাম। ফুরফুরে হাওয়ার মধ্যে সমুদ্রের নোনা গন্ধ। আহ সে যে কি সুন্দর অনুভূতি। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ওদের থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছি। বুঝতেই পারিনি। চাঁদ উঠে এসেছে সমুদ্রের বুক থেকে। দূরে কিছু লোক হাটছে। বুঝতে পারছি ভীষণ জোরে কথা বলছে তাঁরা। একটা জেলে নৌকো ফিরছে মাছ ধরা শেষে। মাছ ভাজার গন্ধও ভেসে আসছে নাকে। ছোট ছোট আলোকবিন্দুর মতো দীঘার সৈকতের আলোকমালা এখান থেকে বেশ লাগছে। যেন কতদূর তারামন্ডল থেকে চলে আসা এক অন্য গ্রহের বাসিন্দা।

সমুদ্র তীর থেকে ফিরে আসতে ইচ্ছে করছিল না। তবু ওরা ফিরছিল বলেই খানিক অনিচ্ছাকৃত হয়েই ফিরতে হল। আসার পথে ছোটো ছোটো ঝুপড়ি দোকানগুলো থেকে ঝিনুকের তৈরি জিনিস কেনার আবদার করল তনু। খানিক গাঁইগুই করবার পর প্রণবেশ তাকে কানের রিং কিনে দিল। সায়ন্তী চুপচাপ ছবি তুলতে লাগল। ওদিকে তৌফিক আনমনে গান গেয়ে যাচ্ছিল।

কাল ভোরে আমরা ‘মন্দারমনী’, ‘শংকরপুর’ রওনা হচ্ছি। তাই খাওয়া দাওয়া করে একপ্রস্থ আড্ডা মেরে রাত ২টোয় ঘুমোতে গেলাম সবাই। মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ উঁকি মারছে। গান আড্ডায় সবাই তখন এক অন্য জগতের বাসিন্দা। মনে হল একটু আধটু বৃষ্টি পেলে জমবে ভালো। তবে এখানকার বৃষ্টি ওই একটু আধটু। এই আছে, এই নেই।

রাতে বেশ ভালো ঘুম হয়েছে। ভেবেছিলাম ভোরে উঠে সূর্যোদয় দেখব সবাই। কিন্তু ওই যে রাতে আড্ডা দিলে কি করে হবে। তাই এবার যে যার মতো রেডী হয়ে ব্রেকফাস্ট করে ব্যাগ প্যাক করে হোটেল ছাড়লাম। এখান থেকে আমরা যাব মন্দারমনী। সেখানে ঘুরে তারপর বিকেলের ট্রেনে কলকাতা ফিরে যাব। এই আপাতত লিস্টে আছে।

টোটো ধরে আমরা বালিসাইয়ে পৌঁছলাম। সেখান থেকে আমরা একটা গাড়ি ভাড়া করে প্রথমে শংকরপুর বীচ ঘুরলাম। এই বীচটা খুব বেশি সুন্দর নয়। সমুদ্র ঢেউ খুব কাছে। বীচ বলে কিছু নেই সেরকম। খানিকক্ষণ সেখানে বসে আমরা ডাবের জল, কোল্ড ড্রিঙ্কস খেয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম। এবার আমরা যাব মন্দারমনী।

মন্দারমনী নামটার মধ্যেই একটা রোমান্টিসিজম আছে। যেভাবে তাজপুর নির্জন আর থ্রিলিং। এখানে বেশিরভাগ কাপলেরা আসে। হানিমুন বলুন কিম্বা শর্ট ট্রিপ। সবাই দীঘার পর বেছে নেয় মন্দারমনী। সরকারী বেশ কয়েকটি লজ আছে। বেশ কম খরচে সেখানে থাকা যায়। গাড়ির ড্রাইভার একেবারে সী বীচে নিয়ে গেলো আমাদের। এখানে গাড়ি একেবারে সী বীচের ওপর দিয়ে চালানো যায়। সমুদ্র বীচ থেকে অনেকখানি দূরে। আর নীচে না নেমে আমরা গাড়ি করেই বেশ অনেকখানি গেলাম।

এবার ফেরার পালা। দুপুর হয়ে গেছে। তাই পেটে কিছু দানা দিতে হবে। গাড়ি থামিয়ে খেয়ে নিলাম আমরা। ফেরার পথে আমরা ট্রেনে ফিরব তাই দীঘা স্টেশন পৌঁছলাম ৪টেয়। এখান থেকে ওড়িশা খুব কাছেই। এছাড়াও তালসাড়ি সী বীচ রয়েছে। ট্রেন ৪টে ৩০ এ। তাই বসে রইলাম ফেরার আশায়। কাজ পাগল মানুষদের থেকে একটু দূরে এই যে দু’টো দিন নিজেকে তাজা হাওয়া আর শান্ত পরিবেশ উপহার দিলাম, তার জন্যে নিজেকেই ধন্যবাদ। মাঝে মাঝে এরকম নিজের জন্যেও বাঁচতে হয়। নাহলে পিছিয়ে পড়তে হয়। (মজা করলাম আর কি!)

 

থাকা খাওয়ার জন্যে আপনাকে আগে থেকে হোটেল বুক করতে হবে। হুট করে চলেও যেতে পারেন। তবে সবসময় ভাগ্য সাথ নাও দিতে পারে। থাকবার জন্যে দা প্রিন্স রিসর্ট, প্রিতিকা রিসর্ট, সাগর কিনারে। খাওয়ার জন্যে অস হোটেল আছে, কিম্বা হোটেলেও খেতে পারেন। কিন্তু কস্টলি।

যাবেন কীভাবেঃ ভায়া বাস আপনি ধর্মতলা থেকে অনেক বাস পেয়ে যাবেন। আর যদি ট্রেনে যেতে চান তাহলে হাওড়া থেকে তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেস, দুরন্ত এক্সপ্রেস পাহারিয়া এক্সপ্রেস রয়েছে।