উত্তর-মেরু যাত্রীর ডায়েরী–পর্ব ২

Uttar Meru 2

সৈয়দ আলমাস কবীর : ইউরোপের এত সুন্দর একটা শহরের এমন শ্রুতিকটুর নাম কে দিয়েছিল কে জানে! শুনলেই মনে হয় কেউ যেন খনন-কার্য্য সম্পন্ন করতঃ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে ব্যস্ত! কোপেনহাগেন-এর গোড়াপত্তন হয় দশম শতাব্দীতে। জেলেরাই থাকতো তখন এখানে। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে এটিকে ডেনমার্কের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ৬৮২ বর্গমাইলের এই শহরে প্রায় সাড়ে ছয় লাখ লোকের বাস। অর্থাৎ, আমাদের ঢাকার ধানমণ্ডি বা গুলশানের যে জনবসতি, এখানে তার চেয়েও কম মানুষের বসবাস! আজ অপরাহ্নে কোপেনহাগেন বিমানবন্দরে অবতরণ করেই ঠাণ্ডা আবহাওয়ার সাথে মোলাকাত হলো।

আমিরাতী বিমানের সৌজন্যে দেওয়া গাড়ীতে করে হোটেলে পৌঁছুতে বেশী সময় লাগলো না। হাতমুখ ধুয়ে একটু তরতাজা হয়ে, গায়ে একখানা সোয়েটার আর একটা কোট চড়িয়ে বেরিয়ে পরলাম শহর দেখতে। ট্যাক্সি করে যখন শহরকেন্দ্রে পৌঁছুলাম, ততক্ষণে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। একে ৪ ডিগ্রী তাপমাত্রা, তার উপর বৃষ্টি আর থেকে থেকে বাতাস; মনে হচ্ছিল হাত-পা জমে পাথর হয়ে যাবে। ভাগ্যিস একজোড়া দস্তানা এনেছিলাম সাথে। ওটা না থাকলে হাত আর মুঠো করতে পারতাম না! মনে মনে দ্বিগুণ শিউরে উঠলাম উত্তর-মেরুর কথা ভেবে। চার ডিগ্রীতেই যদি এ হাল হয়, তা’হলে সুমেরুতে হিমাঙ্কের নীচে যখন তাপমাত্রা হবে, তখন কী হবে আমার! যথেষ্ট গরম কাপড় এনেছি তো! সুমেরুর শীত নিবারণ করতে পারবে তো সে সব! গায়ে না হয় কয়েক স্তরে জামা পরা যাবে; পায়ে কী হবে! ঠাণ্ডার মধ্যে এমন হু হু বাতাস বইলে তো হাড় কাঁপিয়ে দেবে!

নিজেকে বেশ শৈত্যজয়ী মনে হত আমার। তাই সত্যিকারের শীতবস্ত্র কখনই আমার সংগ্রহে ছিল না। এবার সাথে করে আনা কাপড়গুলোও অনেকটা তাচ্ছিল্য করেই নিয়ে আসা। স্ত্রীর জোরাজুরিতে আজ বেরোনোর সময় তিনস্তরের কাপড় পরে মনে মনে লজ্জাই পাচ্ছিলাম। কিন্তু, ট্যাক্সি থেকে নামার সাথে সাথে যে ধাক্কাটা পেলাম, তা’তে আমার শৈত্যজয়ের ঔদ্ধত্য নিমেষে উড়ে গেল! ঠাণ্ডার ধারালো ছুরির হাত থেকে পালানোর জন্য সামনে একটা রেস্তোরাঁ পেয়েই ঢুকে পড়লাম সেখানে। লেবানীজ খাবারের দোকান। ভাইকিং-এর দেশে এসে কিনা ভূমধ্যসাগরীয় খাবার খাবো! কিন্তু, এই ঠাণ্ডার সাথে যুদ্ধ করতে হলে একটু দম নিতেই হবে। অগত্যা শর্মা আর ফালাফেল খেয়ে কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করার চেষ্টা করলাম। গা একটু গরম করে, মাথা ঢেকে, দস্তানা পরে রাস্তায় নামতেই কনকনে হিমেল বাতাস জানান দিয়ে গেল, এত হালকায় কাজ হবে না! বোঝার আর বাকি রইলো না যে, হিমাঙ্কের নীচে যে তাপমান হবে সুমেরুতে, তা’ মোকাবেলা করতে হলে আরও সাজসরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে। কাছেই একটা দোকানে পেয়ে গেলাম উলের মোজা। সবথেকে মোটা মোজা জোড়া কিনে নিলাম পা-দুটোর রক্ষাকবচ হিসেবে। যদিও সাথে আনা গরম কোটগুলোর সাথে ঘোমটার ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও কান ঢাকার একটা অতিরিক্ত ব্যবস্থা করতে হবে।

ওস্টারগাডে-তে পায়ে হাঁটার রাস্তা, আর তার দু’পাশে দোকানপাট। এসব রাস্তায় মোটরযান চলা নিষিদ্ধ। ইউরোপের প্রায় সব পুরনো শহরেই এরকম পেডাস্ট্রিয়ান মল বা পাদচারী চত্ত্বর আছে। হালফ্যাশনের দোকান, ভাল রেস্তোরাঁ ইত্যাদি এসব জায়গায় থাকে। কোপেনহাগেনও এর ব্যতিক্রম নয়। শীত উপেক্ষা করেই ঘন্টা দুই হেঁটে বেরালাম আমরা শহরকেন্দ্রের অলিগলিতে। কাল অস্‌লোর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো; শরীরটাকে তো একটু ধাতস্থ করতে হবে ঠাণ্ডার সাথে। একটা কফিখানায় ঢুকে এক মগ গরমা-গরম কফি খেয়ে দেহকে উষ্ণ করে ট্যাক্সিতে চেপে বসলাম। ট্যাক্সিওয়ালার নাম ফারুক, আমাদেরই উপমহাদেশীয়, যদিও এখানেই তা’র জন্ম আর বেড়ে ওঠা। বললাম, শহরটাকে একটু ঘুরে দেখাতে। বেশ উৎসাহ নিয়ে সে আমাদের নিয়ে গেল সপ্তদশ শতাব্দীর নাইহাওন বা নতুন বন্দরে। নাইহাওন খালের পাশ দিয়ে নানান রঙের সারি সারি বাড়ীর সমন্বয়ে এই সাড়ে চারশো মিটার লম্বা বন্দরটি একসময়ে ব্যবহার হতো সমুদ্রপথের সাথে যোগাযোগ হিসেবে। ‘লিট্‌ল মারমেড’ খ্যাত জনপ্রিয় রূপকথা-শিল্পী হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন বাস করতেন এখানে। বর্তমানে এ জায়গাটি একটি পর্যটন দ্রষ্টব্য। নৌকা ভাড়া করে এই খালে ভমণ করা যায়; যদিও সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ায় এ যাত্রা সেটির আর সময় হলো না আমাদের। সুমেরু থেকে যদি না জমে গিয়ে ফিরতে পারি, তখন চেষ্টা করবো এই খালভ্রমণের। কোপেনহাগেনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘লিট্‌ল মারমেড’-এর একটি ব্রোঞ্জ মূর্তি রয়েছে এ শহরের ল্যাঙ্গিলিনিতে। আগে বার দু’য়েক গিয়েছি দেখতে আমার ছোটবেলার অতিপরিচিত সেই মৎস্যকন্যাকে দেখতে। এবার অবশ্য আর যাওয়া হলো না।

কোপেনহাগেন বন্দরে অপেরা হাউজের অপর পাড়ে বছর দুই আগে ফ্রস্ট উৎসবের সময়ে ‘দ্য ওয়েভ’ নামের ৮০ মিটার লম্বা ত্রিকোণ এলইডি বাতির একটি মিথষ্ক্রীয় প্রতিস্থাপনা তৈরী করা হয়েছিল। ত্রিভূজাকার সুড়ঙ্গপথে মানুষ হেঁটে গেলে নানান বিদ্ঘুটে সব অতিপ্রাকৃত আওয়াজ হতে থাকে। অনেকটা ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’-এর ভূতের রাজার মত। আলো জ্বলছে, নিবছে, অদ্ভুতুড়ে কন্ঠে কী যেন সব বলছে! জনপ্রিয়তার কারণে স্থাপনাটিকে এখনও রেখে দেওয়া হয়েছে। সেখানে গিয়ে কিছু ছবি তুললাম আমরা। এরপর একে একে আমালিয়েনবর্গ রাজপ্রাসাদ আর টাউন-হল হয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। দোকানপাট সবই বন্ধ হয়ে গেছে ৬টা নাগাদ। হাতে গোনা দু’একটা খোলা পাওয়া যেতে পারে, তা’ও বড়জোর রাত ৮টা পর্যন্ত। এরপর কোপেনহাগেন পুরোপুরি ঘুমন্ত। বেশ কিছু সুন্দর সুন্দর স্থাপনা, প্রতিকৃতি, ভবন এখানে রয়েছে বটে, তবে সেগুলো কোনটাই ন্যায্যভাবে প্রদর্শিত নয়। কিছু বাতি দিয়ে এগুলোকে সুন্দর করে প্রদর্শন করা যেতেই পারে। কিন্তু ড্যানিশরা হয় আত্মপ্রচার পছন্দ করে না, নতুবা রাতের অন্ধকারে এগুলোকে যে বাতি জালিয়ে দেখানো যেতে পারে, সেটা তা’দের মাথায়ই আসে না। রাতে তো মানুষ ঘুমায়, দেখবে কে!

শর্মা আর ফালাফেল এখনও পাকস্থলী জবরদখল করে রেখেছে। তাই নৈশভোজনটা বাদ দেওয়া হলো। কাল ভোর ছ’টায় গাড়ী এসে তুলে নেবে আমাদের নরওয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য। তাপমাত্রাটা তখন কত নীচে থাকে তা’ নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন আছি। যাই, শৈত্যজয়ীর খেতাবটা জলাঞ্জলি দিয়ে জামার স্তর ক’টা বাড়াবো তা’র হিসেব করি গিয়ে।

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।