উত্তর-মেরু যাত্রীর ডায়েরী–পর্ব ৩

Uttar Meru 3

সৈয়দ আলমাস কবীর : ঘুম যখন ভাঙলো, সূর্য্য ওঠেনি তখনও। হোটেল-কামরার তাপ-নিয়ন্ত্রিত উষ্ণ বিছানাটা ছাড়তে যে যথেষ্ট মনের জোর লেগেছিল, তা’ বলাই বাহুল্য। কিন্তু গাড়ীওয়ালাকে বলা ছিল সকাল ৬টায় বেরুবো। তাই, কাপড়জামা পরে তৈরী হয়ে বের হতেই হলো। গতসন্ধ্যার হাঁড়-কাপানো অভিজ্ঞতার পর আজ আর ঝুঁকি নেওয়ার সাহস করলাম না। প্রথমে থার্‌মাল, তার ওপর পাতলা সোয়েটার, তারপর ফ্লানেলের জামা, তুলাভর্তি হাতকাটা কোট, আর সবার ওপর একটা লম্বা মোটা জ্যাকেট – এই পাঁচ স্তরের বর্ম পরে বের হলাম শীতের সাথে যুদ্ধ করতে। উত্তমাঙ্গ যদিও নিরাপদ; পা-জোড়া নিয়ে একটু চিন্তা থেকেই গেল।

এক মগ গরম কফি দিয়ে শরীরটাকে তাজা করে বেরিয়ে পরলাম রাস্তায়। গন্তব্য অস্‌লো – নরওয়ের রাজধানী। মাঝে পেরুতে হবে সুইডেন। কোপেনহাগেন থেকে মোটামুটি মিনিট কুড়ি পরেই সুইডেনের সীমানা। ওরেযুন্ড প্রণালীর উপর দিয়ে প্রায় ৮ কিলোমিটার লম্বা এক সেতু ডেনমার্ক আর সুইডেনের দূরত্বকে অনেকখানি কমিয়ে দিয়েছে। এই সেতুর মাঝামাঝি থেকেই সুইডেনের সীমান্ত শুরু। সেতুর শেষে একটি নামমাত্র শুল্ক ও অভিবাসন কেন্দ্র আছে ঠিকই, কিন্তু অত সকালে কেউই কাজে আসেনি। আমরা তাই বিনা বাঁধায় ঢুকে পড়লাম ইউরোপের আরেকটি দেশে। এধরণের প্রায়-মুক্ত সীমানা কি হতে পারেনা আমাদের উপমহাদেশের দেশগুলোর মধ্যে! ইংরেজদের তাড়াহুড়ো করে ইচ্ছেমাফিক করা দেশভাগ কত মানুষকে যে ভিটেমাটি-হারা করেছে। ধর্মের নামে ভাগ করে নতুন জাতিসত্ত্বা তৈরী করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস, কৃষ্টি, ভাষা – এসব তো একই রয়ে গেছে। সেই মানুষগুলোকে কেন অন্ততঃ অবাধে চলাচল করতে দেওয়া যায় না! কেন নিজের আপনজনের সাথে মিলিত হতে হলে সরকারের অনুমতি লাগে! বিচ্ছিন্নতাবাদের এই যুগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটা অনুকরণীয় আদর্শস্বরূপ। এজন্য এই মহাদেশের মানুষগুলোকে আমার স্যালুট জানাই!

ঘন্টা তিনেক পর ক্ষিদে চেপে ধরলো। গাড়ীচালককে বলে কাছাকাছি এক ছোট শহরে থামলাম আমরা। বার্গার আর স্যাণ্ডঊইচ দিয়ে পেটকে শান্ত করে আবার গাড়ীতে উঠতে গিয়ে দেখি, গাড়ীর চাকায় হাওয়া নেই। কী আর করা! গাড়ীচালক পাকিস্থানী বনশোদ্ভূত বাসারাত-কে বললাম চাকা সারিয়ে আনতে; ততক্ষণ কাছের একটা ছোট দোকানে ঢুকে এটা ওটা দেখতে দেখতে কালক্ষেপন করতে থাকলাম। ঘন্টাখানেক বাদে বাসারাত মিঞা চাকা বদলে ফিরে এলেন। আবার যাত্রা শুরু। সাত ঘন্টার পথ, বাকি আরও চার ঘন্টা। সুইডেনের রাস্তা দিয়ে একশ’ কিলোমিটার বেগে চলেছি আমরা। গাড়ীচালককে তাড়া দিতে সে জানালো, এই ভাড়ার গাড়ীর গতিবেগ পুলিশ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। একশ’-র বেশী যাওয়ার কোন উপায় নেই। এছাড়াও গাড়ীতে একটি যন্ত্র বসানো আছে, যা দিয়ে পুলিশ এই গাড়ীর উপর সর্বক্ষণ নজর রাখতে পারে। তাই নিয়ম ভাঙার জো নেই! পুলিশের এই তদারকিতে বেশ অবাক হলাম আমি; মনে মনে তারিফও করলাম। আমাদের পুলিশ-বাহিনীর যে কতকিছু শেখার আছে এখনও!

কিছুদূর পরপর সারি সারি প্রকাণ্ড বাতচক্র বা উইণ্ডমিল দেখতে পাচ্ছিলাম। বায়ুশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চলেছে। কয়লা, গ্যাস, তেলের উপর থেকে এরা নির্ভরতা কমিয়ে নিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। বৈশ্বিক উষঙ্গতাকে ইউরোপিয়নরা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। রাস্তায় আজকাল প্রায়শঃই বিদ্যুৎচালিত গাড়ী এখানে দেখতে পাওয়া যায়। আর পরিবেশ-বান্ধব সাইকেলের তো কথাই নেই! এককালে জানতাম চীনেরা শুধু সাইকেল চালায়। এখন ব্যাপারটা উল্টো। ওরা এখন নতুন পয়সা পেয়ে বড় বড় তেল-পিপাসু গাড়ীতে চড়ে, আর বিশ্বসেরা গাড়ী-প্রস্তুতকারী ইউরোপীয়নরা এখন পদচালিত দ্বিচক্রযান চালিয়ে পরিবেশকে নির্মল রাখার চেষ্টা করে। ডেনমার্কে নাকি লোকসংখ্যার দ্বিগুণ সাইকেল আছে; অর্থাৎ অনেকেরই একটির বেশী রয়েছে। রাস্তাঘাটও সাইকেল-বান্ধব; আলাদা করে নির্দেশিত ও সংরক্ষিত সাইকেল-পথ আছে। সাইকেল-চালক ও পথচারীদের এখানে পথাধিকার অধিকতর। আমাদের ট্রাক যেমন পথের রাজা, এখানে রাজা সাইকেল! গাড়ীওয়ালারা এদের বেশ সমীহ করেই চলেন। আমাদের দেশে ‘রাইড-শেয়ারিং’-এর নামে হঠাৎ করেই মোটরসাইকেলের উৎপাত ইদানীং বেড়ে গেছে। ‘উৎপাত’ বললাম একারণে, যে এরা নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে প্রায়শঃই কথা নেই বার্তা নেই ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে। গাড়ীর সারির ফাঁকফোঁকর দিয়ে, বা কখনও ফুটপাতের ওপর দিয়ে চলে এই মোটসাইকেলওয়ালারা।

আসলে আমাদের ‘রাইড-শেয়ারিং’-এর পুরো ধারণাটাতেই গলদ রয়েছে। আমেরিকায় উবার রাইড-শেয়ারিং শুরু করেছিল এমনভাবে যে, কেউ তা’র নিজের গাড়ীতে অন্য কাউকে পয়সার বিনিময়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেবে, অর্থাৎ সে তা’র রাইড বা যাতায়তটা আরেকজনের সাথে শেয়ার করবে। আমাদের দেশের এই সেবাগুলো সত্যিকার অর্থে ‘শেয়ারিং’ তো নয়ই, বরং মোটরসাইকেলে এই সেবা প্রদানের অনুমতি দিয়ে আমরা কি তা’দের ট্রাফিক আইন ভাঙার বৈধ্তা দিচ্ছি না! গাড়ি শেয়ারিং না করে মোটরসাইকেল শেয়ারিং করা হছে, কারণ যানযটের মধ্যে পাশ কাটিয়ে লালবাতি উপেক্ষা করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো যাচ্ছে; অর্থাৎ ট্রাফিক আইনকানুনের পিণ্ডি চটকানো হচ্ছে!
সুইডেন পার হয়ে নরওয়েতে ঢোকার মুখেও অতি হালকা একটু লোক-দেখানো সীমারক্ষার আয়োজন। ড্রাইভারকে শুধু জিজ্ঞেস করলেন এক পুলিশ কর্মচারী যে কোথায় যাচ্ছে আমদের গাড়ী। ড্রাইভার উত্তর দিতেই ইশারায় যেতে বলা হলো আমাদের। ডেনমার্ক, সুইডেন পেরিয়ে নরওয়ে। একই দিনে তিন তিনটি দেশ পাড়ি দিলাম আমরা। আশেরপাশের দৃশ্যের অবশ্য তেমন কোন পরিবর্তন চোখে পড়লো না। সেই একই ধরণের বাড়ীঘর, শষ্যক্ষেত, আর কিছুদূর পরপর বাতচক্ররাজি। অস্‌লো আসতে আরও কিছু পটহ বাকি। আমাদের এযাত্রা চূড়ান্ত গন্তব্য অস্‌লোর বিমানবন্দর। সেখান থেকে বিমানে চেপে যাবো ট্রম্‌সৌ, সুমেরুবৃত্তের মধ্যে।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বিমান যখন ট্রম্‌সৌ-তে নামলো, তখন আকাশে তুষারঝটিকা হচ্ছে। অনেকদিন পর তুষারপাত দেখলাম। মনে পড়ে গেল, ‘বাক্স-রহস্য’-এ সত্যজিৎ লিখেছিলেন, বরফ পড়ার কোন শব্দ হয়না। উত্তর-মেরু আমাদের স্বাগত জানালো এক ভারী নিশব্দ তুষারপাত দিয়ে। বিমানবন্দর থেকে বেড়িয়ে দেখি চারিদিক সাদা বরফে ঢাকা। রাস্তায়ও বরফ জমে আছে; কিছু কিছু জায়গায় উপরের স্তরটা গলে পিচ্ছিল হয়ে আছে পথ। ট্যাক্সির জন্য লাইন দিয়ে আছে জনা পঞ্চাশেক। কিন্তু লাইন-ভাঙাতে স্বভাবজাত পটু বাঙালীকে তো আর এতবড় লাইনে দাঁড়িয়ে রাখা যায়না! অতি সাবধানে উল্টো দিকে গিয়ে এক ট্যাক্সিওয়ালাকে ধরলাম। মালামাল উঠিয়ে হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই। সারাদিন ধরে যাত্রাপথে আছি; গন্তব্যে এসে এটুকু ফাঁকিবাজিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেই পারেন।

হোটেলের রুমে ঢুকে মনটা ভাল হয়ে গেল। ততক্ষণে বরফ পড়া থেমেছে। জানালা দিয়ে দেখি, সামনে উপসাগর, ওপারে তুষারাবৃত উঁচু পাহাড়, গাড়ী-বাড়ী-দোকানপাট সব বরফে মোড়া। দূরে দেখা যাচ্ছে ট্রম্‌সৌর বিশেষ আকর্ষণ সেই ত্রিকোণ ট্রমসডালেন গীর্জা। কাল থেকে মেরু-অভিযান শুরু। উত্তেজনায় আজ রাতটা কাটবে তো!

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।