উত্তর-মেরু যাত্রীর ডায়েরী–পর্ব ৪

Almas Kabir 4

সৈয়দ আলমাস কবীর : শীতের দেশে ভোরবেলা শয্যাত্যাগ যে কতবড় একটা চ্যালেঞ্জ, সেটা লিখে বোঝানো আমার কম্ম নয়। প্রণোদনা একটাই, তা’ হলো মেরুর বরফের পাহাড়ে উঠে বল্গাহরিণ-টানা স্লেজগাড়ীতে চড়া। অতঃপর হোটেলের হরেক পদ-সম্বলিত প্রাতঃরাশ শেষ করে বাসে চড়ে বসলাম। এক ঘন্টা দূরে এক পাহাড়ের উপর রয়েছে একটি সামি উপজাতিদের গ্রাম; সেখানে তা’দের প্রধান জীবিকা হলো পশুপালন। বল্গাহরিণ এখানকার প্রধান গবাদি পশু। এই পশুপালনের পাশাপাশি বল্গাহরিণের আর তা’দের জীবনযাত্রার উপর নির্ভর করে একটা পর্যটন শিল্প গড়ে তুলেছে। পর্যটকদের আকর্ষিত করার জন্য বল্গাহরিণ-টানা স্লেজগাড়ীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এখানে।

সামি-দের বরফ-ঢাকা গ্রামে যখন পৌঁছুলাম, আকাশ তখন ঝলমলে। একটা বিশালাকায় শঙ্কুসদৃশ তাবুতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। তাবুর ভেতর ঠিক মাঝখানে আগুন জ্বালানো আছে। তা’র চারিদিক ঘিরে আছে বসার বেঞ্চি। বেঞ্চির ওপর ঠাণ্ডা প্রতিরোধক হিসেবে বিছানো আছে বল্গাহরিণের চামড়া। আমাদেরকে বেঞ্চিতে বসিয়ে স্বাগতম জানালো সামিদের পক্ষ থেকে একজন পুরুষ ও একজন মহিলা। আমাদের বলা হলো স্লেজগাড়ীতে কি করে বসতে হবে, কী কী করা যাবে আর যাবে না, ইত্যাদি। জোরে শব্দ করলে বা হঠাৎ করে অঙ্গভঙ্গি করলে হরিণরা ভয় পেয়ে দৌড় দিতে পারে, এ বলে সাবধান করে দেওয়া হলো আমাদের। আমরা যাদের কাছে এসেছি, এদের পালে আছে তিনশ’ বল্গাহরিণ। এগুলো সবগুলিই বন্য। কিন্তু বছরের এ সময়টাতে এদেরকে সমতল উপত্যকায় নিয়ে এসে বেড়া দিয়ে রাখা হয়। তখন এরা গৃহপালিতের মতই আচরণ করে। কিন্তু, যখনই আবার এদেরকে পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখনই এদের সহজাত প্রবৃত্তি ফিরে আসে চট্‌ করে, এবং আবার সহজেই এরা মুক্ত বন্য পরিবেশে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। আমরা দু’জন করে একেকটি স্লেজগাড়ীতে বসলাম। স্লেজ হলো মসৃণ কাঠের তৈরী পাটাতনওয়ালা লম্বা আরামকেদারার মত বিশেষ গাড়ী, যাকে বরফের উপর দিয়ে সহজেই টেনে নিয়ে নেওয়া যায়। বরফের দেশে পরিবহনের জন্য এই স্লেজগাড়ী খুব জনপ্রিয়। একেক দেশে একেকভাবে স্লেজ টানা হয়।

এই বল্গাহরিণের দেশে হরিণরাই স্লেজ টানে। আমাদের গাড়ীটির সামনে যেটি বাঁধা আছে, সেটি মোটামুটি মাঝারী আকারের। মর্দ, তবে শিঙ পড়ে গেছে সদ্য। বছরে এরা একবার করে শিঙ বদলায়। যখন নতুন করে শিঙ গজায়, মখমলের একটা আবরণ থাকে এই শিঙের উপর। বড় হলে এই আবরণটি ঝরে যায়। খুব দ্রুতই শিঙগুলো বড় হয়; ৪ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে একেকটা। প্রায় ১৫ কেজি পর্যন্ত এই একেক শিঙের ওজন বহন করার জন্য যথেষ্ট বলবান হয়ে থাকে এই ব্লগাহরিণগুলো। তাই আমাদের দু’জনকে টেনে নিয়ে যেতে মোটেও কষ্ট হচ্ছিল না এই তুষারপ্রাণীটির। প্রায় পৌনে এক ঘন্টা বরফঢাকা পাহাড়ের উপর দিয়ে স্লেজে চেপে প্রকৃতিটাকে দেখলাম, মেরুদেশের নৈসর্গিক পরিবেশটাকে অনুভব করার চেষ্টা করলাম। ফিরে আসার পর তাবুতে জড় হলাম আবার। এক সামি মহিলা আমাদের আপ্যায়ন করলেন হরিণ-মাংসের স্যূপ দিয়ে। সামি জীবনযাত্রার কথা শোনালেন আমাদের। পৃথিবীতে প্রায় দেড় লাখ সামি উপজাতীয়দের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ হাজার আছে নরওয়েতে। বাকিরা আছে সুইডেন ও ফিনল্যাণ্ডে। এছাড়াও হাতে গোণা কিছু সামি বাস করে রাশিয়া, আমেরিকা ও ইউক্রেণে। এদের বিশেষ ধরণের কাপড় ও আনুষঙ্গিক ঊপকরণ, তৈজসপত্র ইত্যাদি দেখলাম আমরা। নরওয়েতে একসময়ে আইন করে সামি সভ্যতাকে ধংস করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। নিয়ম করে স্কুল থেকে সামি ভাষার চর্চা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন ধরে আবার এই কৃষ্টি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পশুপালন ও মাছ ধরাই সামিদের প্রধান জীবিকা। এছাড়াও কিছু সামি খণিতে কাজ করে বা কাঠুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে ত্থাকে।

সামি-গ্রাম থেকে বাসে করে আবার ফিরে এলাম হোটেলে। রেইনডিয়ার-এর মাংসের স্যূপ খেয়ে পেট ভরাই ছিল; তাই আর মধ্যাহ্নভোজের প্রয়োজন হলো না। হোটেলের কামরায় কিছুটা সময় গড়িয়ে নিয়ে, বিকেলে পায়ে হেঁটে শহর দেখতে বেরুলাম। রাতে যাবো সুমেরুর প্রধান আকর্ষণ মেরুপ্রভা দেখতে। ট্রম্‌সৌ শহরটা বেশ সাজানো-গোছানো। দৃষ্টিনন্দন একটা টাউন-স্কোয়ার বা শহরকেন্দ্র আছে, যার মাঝখানে আছে একটি গীর্জা। চারিপাশে আছে সারি সারি হাল-ফ্যাশনের দোকানপাট। তবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, এর বেশীভাগই হয় পর্যটন ব্যবসায়ী, নয়তো নিদর্শন স্মারক বিক্রেতা, অথবা বহিরঙ্গন ক্রীড়া-বিষয়ক সরঞ্জাম ব্যাপারী। এটা যে একটা পর্যটনের শহর, তা’ একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়। পর্যটনের প্রধান কারণ হলো, অরোরা বোরালিস বা মেরুপ্রভা।

অরোরা বোরালিস হলো সুমেরু অঞ্চলের আকাশে দৃশ্যমান বর্ণিল মনোরম আলোকচ্ছটা। এক সময় একে অতিপ্রাকৃতিক বলে বিবেচনা করা হতো। অনেক আদিবাসিরা মনে করতো, তা’দের পূর্বপুরুষদের আত্মা আলোকরাজি হয়ে ঘুরে বেরাচ্ছে আকাশে। আবার কেউ বা মনে করতো, মৃতেরা একসাথে হয়ে সিন্ধুঘোটকের মাথার খুলি নিয়ে ফুটবল খেলছে। আল্‌গঙ্ক্যুইন উপজাতীয়রা মনে করতো, তা’দের স্রষ্টা নানাবঝ্‌হো আগুন জ্বালিয়ে জানান দিচ্ছেন যে তিনি তা’দের নিয়মিত দেখভাল করছেন। গ্রীনল্যাণ্ডে ধারণা ছিল, এই আলো আসলে মৃতজাত বাচ্চাদের আত্মা। সামি-রা মনে করতো, অনেক দূরে মহাসাগরে তিমি মাছের পাল থেকে উদ্বীর্ণ পানির গাঁজলাই হচ্ছে এই আলোকচ্ছটা। গ্রীকরা মনে করতো, চন্দ্র ও সূর্য্যদেবের ভগ্নী ঊষাদেবী আকাশের এ প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে তাঁর রঙিন রথে করে ছুটে চলার সময় এই বহুবর্ণের দীপ্তির সৃষ্টি হতো। এই গ্রীক দেবীর নামেই এই মেরুপ্রভাকে বলা হয় আরোরা। বৈজ্ঞানিকভাবে বলতে গেলে ব্যাপারটা কিন্তু আরও বেশী কৌতূহলোদ্দীপক। সূর্য থেকে বেরিয়ে আসা কিছু ইলেকট্রন, প্রোটন প্রভৃতি দিয়ে তৈরী হয় সৌরঝড় । এই সৌরঝড় যখন তীব্র শক্তি নিয়ে পৃথিবীর উপর আসতে চায়, তখন বায়ুমণ্ডলের চৌম্বক-আবহ বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার একে বাধা দেয় । সংঘর্ষের কারণে পরমাণু বা অণুসমূহ কিছু শক্তি লাভ করে চার্জিত কণিকাসমূহের কাছ থেকে যা অভ্যন্তরীণ শক্তি হিসেবে সঞ্চিত হয়। এসব অভ্যন্তরীণ শক্তি যখন আলোকশক্তি হিসেবে বিকরিত হয়, তখনই মেরুপ্রভা বা অরোরা দেখা যায়। সুমেরুতে যে মেরুপ্রভা দেখা যায়, তা’কে বলে অরোরা বোরালিস, আর কুমেরুর মেরুপ্রভাকে বলে অরোরা অস্ট্রালিস।

তা’ এই মেরুপ্রভা দেখতেই ট্রম্‌সৌতে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে। আমরাও এসেছি একই কারণে। কিন্তু মুস্কিল হলো, এই অরোরার দেখা পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। যদিও এই প্রভা সর্বদাই আকাশে থাকে, কিন্তু আলো বা মেঘের কারণে একে সবসময় দেখা যায় না। তাই পর্যটকরা এই মেরুপ্রভাকে তাড়া করে বেড়ায় বিভিন্ন মেরু অঞ্চলে। আজ রাতে আমরা তাড়া করবো অরোরাকে। ভাগ্য কি প্রসন্ন হবে আমাদের! পারবো কি উষাদেবীর দর্শন পেতে!

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।