উত্তর-মেরু যাত্রীর ডায়েরী–পর্ব ৫

almas bhai 5

সৈয়দ আলমাস কবীর :  দিনের পর দিন চলে যায়, তবু ঊষাদেবীর দর্শন মেলা ভার হয়। পর্যটকের দল মেরু অঞ্চলের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ান সেই বহুপ্রতিক্ষীত মেরুপ্রভা দেখতে। আমাদেরই পরিচিত একজন মাস খানেক সাধনা করে অবশেষে দেখতে পেয়েছিলেন আলোচ্য এই অরোরা বোরালিস। কিন্তু ভাগ্যদেবী যে আমাদের উপর অতিপ্রসন্ন, তা’র হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম যখন প্রথম রাতেই বাজিমাৎ করলাম আমরা!

তাড়াতাড়ি রাতের খাবারটা সেরে চলে গেলাম পর্যটন অফিসে। সেখানে আমাদেরই মত আরও জনা কুড়ি পর্যটক জড়ো হয়েছেন মেরুপ্রভার পেছনে ছুটতে। আমাদের সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হলো কিভাবে আমরা একঘন্টা দূরের একটা নির্জন স্থানে গিয়ে অপেক্ষা করবো। এই বাহারী আলোকচ্ছটা দেখতে পাওয়ার জন্য প্রয়োজন অন্ধকার কোন জায়গা, যেখানে কৃত্তিম আলো-দূষণ নেই। তাই শহর থেকে বেশ কিছু দূরে এক নিরিবিলি নিভৃত স্থানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হবে। ভ্রমণ-প্রদর্শক সাথে থাকবে আমাদের ও পরিচালনা করবে পুরো অভিযানটি। যদিও কয়েকস্তরে শীতবর্ম চড়িয়েই এসেছিলাম, তবুও আমাদের বলা হলো একটা ইয়া বিশাল এক জোব্বা পরিধান করতে, অনেকটা মহাকাশচারীরা যেমন পরে। ধরেই বুঝলাম, এই গাত্রাবরণ থাকলে স্বয়ং হিমদেবেরও ক্ষমতা নেই আমাদের কাবু করার। সাথে এক জোড়া গাম্‌বুটও দেওয়া হলো আমাদের। তিনফুট উঁচু বরফের উপর দিয়ে হাঁটতে হলে আমার সাধারণ দৌড়ঝাঁপের কেড্‌স জুতোর যে বেহাল অবস্থা হবে, তা’ বলাই বাহুল্য। তাই অভিজ্ঞ পেশাদারদের দেওয়া জোব্বা আর গামবুট পরে তৈরী হয়ে নিলাম সকলে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, এই জোব্বা পড়াটা কী যে এক ঝক্কি, তা’ নিজে না পরে থাকলে বোঝানো যাবে না। যা’হোক অবশেষে আপাদমস্তক শীত-নির্ভেদ্য ভূষণ পরিধান করে মেরুপ্রভার উদ্দেশ্যে ছুটলাম।

এক ঘন্টা বাদে এক জলাশয়ের তীরে এসে আমাদের গাড়ী থামলো। আমাদের অভিযান পরিচালক ও তা’র সহযোগী জায়গাটা নিরাপদ কিনা নিরীক্ষা করে নিলেন। তারপর বেলচা দিয়ে বরফ সরাতে সরাতে একটা সরু পথ বানিয়ে এগোতে থাকলেন, আর আমরা তাঁ’দেরকে অনুসরণ করতে থাকলাম। চারিদিকে ঘুটঘুটে আঁধার আর প্রচণ্ড শীত। গায়ে ঠাণ্ডা অনুভব না করলেও মুখমণ্ডল জমে অবশ হয়ে যাচ্ছিল। দাঁত তোলার পর যেমন চোয়ালে চিমটি দিলে কিছু বোঝা যায় না, অনেকটা সে রকম বোধ হচ্ছিল। কিছু চ্যালাকাঠ সঙ্গেই আনা হয়েছিল, সেগুলো দিয়ে একটা ছোট অগ্নিকুণ্ডলি তৈরী করা হলো। সেটিকে ঘিরে বেলচা দিয়ে বরফ কেটে বেঞ্চির মত বানানো হলো। ততঃপর সেই বরফ-বেঞ্চিতে বসে আমরা ঊষাদেবীর জপ করতে থাকলাম। রাত তখন সাড়ে ন’টা। মেঘমুক্ত আকাশ; তারকারাজি আকাশ জুড়ে জ্বলজ্বল করছে। মেরুপ্রভা দেখতে পাওয়ার জন্য আদর্শ আবহাওয়া এটি। মনে তাই একটা চাপা আশাবাদী উত্তেজনা। সোয়া দশটা নাগাদ উত্তরাকাশে একটা মেঘ-সদৃশ ধুম্ররাশি দেখতে পাওয়া গেল। ক্যামেরার শাটারের গতি কমিয়ে ছবি তুলে বুঝলাম, অরোরা আসছে। ছবিতে কালো আকাশে হালকা সবুজের আভা দেখা যাচ্ছে। খালি চোখে দেখার মত ঊষাদেবী তখনও প্রকট হননি। উদ্গ্রীব হয়ে চেয়ে বসে থাকলাম সবাই আকাশপানে চেয়ে। ধোঁয়াটা আস্তে আস্তে কেমন যেন ধনুকের মত আকার ধারণ করলো। সবাই আমরা ততক্ষণে ছবি তুলতে ব্যস্ত। নানান ভঙ্গিমায় ছবি তুলে যখন কিছুটা পরিতুষ্ট হলাম, ঊষাদেবীর রথ ততক্ষণে চলে গেছে। ঠিক করলাম আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবো, যদি রথ ফিরে আসে। আমাদের ভ্রমণ-প্রদর্শকরা আমাদের জন্য গরম গরম স্যূপ তৈরী করলেন। আলু, গাজর, পেঁয়াজ আর বল্গাহরিণের মাংস দিয়ে বানানো এই স্যূপ খেয়ে গা গরম করে আরও কিছুক্ষণ বসলাম। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে তখন। বুঝলাম, আজকের মত অভিযান এখানেই শেষ। তবে, প্রথম রাতেই মেরুপ্রভা দেখতে পাওয়াটা দারুণ একটা সৌভাগ্যের বিষয় বৈকি!

পরের দিন রাতে আবার বেরুলাম মেরুপ্রভার দর্শনপ্রার্থী হয়ে। তবে এবার স্থলপথে নয়, জলপথে। প্রায় ৫০ ফুট লম্বা এক ক্যাটাম্যরানে চেপে সুমেরুবৃত্তের একেবারে মধ্যিখানে যাওয়ার প্রচেষ্টা। ক্যাটাম্যরান হলো জোড়া-কাঠামোর এক বিশেষ জাহাজ। দু’টি কাঠামো বলে এটি বেশ সুস্থিত, খুব বেশী দোলে না, অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত নিরাপদ একটা জলযান। জন দশেক আমরা অরোরা-অভিযাত্রী এই ক্যাটাম্যরানে করে রাত ন’টা নাগাদ রওনা হলাম। উত্তর-মেরুর কাছাকাছি বেশ কিছু সামুদ্রিক খাঁড়ি আছে যেগুলোকে বলে ফিয়র্ড। এই ফিয়র্ডের ভেতর দিয়ে মাঝসমুদ্রে গিয়ে জাহাজে ইঞ্জিন বন্ধ করে অপেক্ষা করতে থাকলাম আমরা। কিন্তু মুশকিল হলো, আজ বেশ জোরে তুষারপাত হচ্ছে। সেই সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। বাতাসও বেশী নেই যে মেঘগুলোকে সরিয়ে নিয়ে যাবে। বুঝতে পারছিলাম যে আজ আবহাওয়া প্রতিকুল। মেরুপ্রভা এই মেঘের ভেতর থেকে দেখা যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। কি আর করা, তাই আজ শুধু জাহাজভ্রমণ করে আর উত্তর মহাসাগরের মাঝখানে তুষারপাত দেখেই চিত্ত বিনোদন করলাম। আজও পুরু গাত্রাবরণ ছিল। তাই সাহস করে কামরা থেকে বেরিয়ে, ক্যাটাম্যরানের পাটাতনের উপর উঠে বসে, গরম চকলেটের কাপ হাতে নিয়ে বরফ পড়া উপভোগ করলাম।

আগামীকাল আবার বেরুবো মেরুপ্রভার সন্ধানে। প্রথমরাতে দেখা দিয়েই কি ঊষাদেবী ছলনাময়ী হয়ে থাকবেন; ধরা দেবেন না আর একটি বার! ভাগ্য-পরীক্ষা করতেই হবে। যদি লাইগ্যা যায়!


লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।