ঘুরে আসি বিনসাড়া গ্রাম থেকে

গোলাম রাব্বী আকন্দ (বগুড়া,প্রতিনিধি) : বেহুলা-লখিন্দরের ঘটনা নিয়ে দুই বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে নানা লোককাহিনী প্রচলিত আছে। এই লোককাহিনীকে কেন্দ্র করেই কানা হরিদত্ত, বিপ্রদাস পিপলাই, বিজয়গুপ্ত, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, দ্বিজ বংশীদাস প্রমুখ মনসামঙ্গল-পদ্মপুরাণসহ নানা কাব্য রচনা করেছেন। আর মনসামঙ্গল কাব্যে যে উজানীনগরের কথা বলা আছে, সেটা যে কোথায় ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না। তবে জনশ্রুতি অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাঁস ইউনিয়নের বিনসাড়া গ্রামই সেই উজানীনগর।

এই গ্রামের সওদাগর বাছু বেনিয়ার মেয়েই বেহুলা সুন্দরী। সময়ের পরিক্রমায় বাছু বেনিয়ার ৫২ বিঘা আয়তনের বাড়ির চিহ্ন বলতে এখন আর কিছুই নেই। তবে বিরান ভিটায় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রয়েছে মাত্র একটি জিয়নকূপ, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা আসেন কালেভদ্রে।

ইতিহাস ও লোককাহিনী থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে বেহুলার বাবা বাছু বেনিয়ার এই বাড়িতেই জন্ম নেয় বেহুলা সুন্দরী। সতী নারীর প্রতীক হিসেবে অনিন্দ্যসুন্দরী বেহুলার রূপ ও গুণের অনেক কাহিনী চলনবিল অঞ্চলের প্রবীণ ব্যক্তিরা বংশ পরম্পরায় শুনে এখনও গল্পচ্ছলে নাতি-নাতনিদের বলে থাকেন। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, তাড়াশ উপজেলার বিনসাড়া গ্রামে বেহুলার পিতৃভিটায় জিয়নকূপ এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওই গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধা সাঈদুর রহমান সাজু জানান, তিনি ছোটবেলায় বিনসাড়া গ্রামে বেহুলার বাড়ির সে সময়কার পুরাতন ইট, সুরকি, ভগ্ন প্রাচীর, শান বাঁধানো পুকুরঘাট, ডুবন্ত নৌকার স্মৃতিচিহ্ন দেখেছেন।

বর্তমানে সেখানেই বিনসাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ভবন হয়েছে। অনেকে বাড়িঘর করে তুলে বসত করছেন। তবে বেহুলার জিয়নকূপ, তার স্নান করার মল পুকুর, ডুবন্ত নৌকার চিহ্ন ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আশপাশের লোকজন এখনও বিনসাড়া গ্রামের বেহুলার পিতৃভিটার ওই পাড়াটিকে ‘বেহুলার পাড়া’ হিসেবে জানেন। বেহুলার পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, অনেক বাড়িতেই মাটি খননের সময় পাওয়া সেই ষোড়শ শতকের বেহুলার বাবার বাড়িতে ব্যবহূত মাটির তৈরি কলস, জগ, ঘটি ও থালা-বাসনের ভগ্নাবশেষ।

ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে বগুড়া জেলার গোকূলে শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেলেও বেহুলার বাসরঘর এখনও কিংকদন্তি নায়িকার স্মৃতি হয়ে আছে। কিন্তু সিরাজগঞ্জের তাড়াশে বেহুলার বাবা বাছু বেনিয়ার বাড়ির স্মৃতি বিলীন হওয়ার পথে। বেহুলা-লখিন্দরের লোহার বাসরঘর পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও সংরক্ষণের অভাবে মানুষ ভুলে যেতে বসেছে বিনসাড়া গ্রামের বেহুলার জন্মভিটা।

স্থানীয় বিনসাড়া গ্রামের সত্তরোর্ধ্ব আমিরুল ইসলাম জানান, আশির দশকে তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান স ম আবদুল জলিল বেহুলার পিতৃভিটার স্মৃতিচিহ্ন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেন। ওই সময়ের ইউএনও জ্ঞানেন্দ্র নাথ এ কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের দেওয়া অর্থ ও সহযোগিতায় প্রথমবারের মতো ১৯৮৭ সালে বেহুলার জিয়নকূপ সংস্কার করা হয়েছিল।

এর প্রায় ২৭ বছর পর ২০১৪ সালে তৎকালীন তাড়াশ ইউএনও শরীফ রায়হান কবির বেহুলার পিতৃভিটার একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন জিয়নকূপটি সরকারি অনুদানের টাকায় সংস্কারের মাধ্যমে দর্শনীয় করে তুলতে তৎপর হন। তবে পরবর্তী সময়ে সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জিয়নকূপটি শ্রীহীন হতে হতে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে কূপের পাশে স্থানীয় ইউনুছ প্রামাণিক নামের এক ব্যক্তি ঝুপড়ি ঘর তুলে চা বিক্রি করছেন। আর আগাছা ও বাঁশঝাড়ে ঢেকে গেছে কূপের চারপাশ। সংস্কারের সময় কূপের মুখ লোহার গ্রিল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলেও ভেতরে নজর দিতেই চোখে পড়ে আবর্জনার স্তূপ।

বিঃদ্রঃ কোথাও ঘুরতে গিয়ে যেখানে সেখানে ময়লা,আর্বজনা, চিপসের প্যাকেট ইত্যাদি না ফেলে নির্ধারিত জায়গায় ফেলেন। জীবনে যা পেয়েছেন তারচেয়ে ভাল কিছু রেখে যান।