থাইল্যান্ড ভ্রমণঃ ৩০তম পর্ব

Thailand 30

মাহাতাব লিটনঃ ব্যাংককের তিনতারকা হোটেলে থাকা বা রাত্রিযাপনে আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু না হতে পারলাম না। এর থেকে ঢাকার নন তারকা হোটেলেই শ্রেয়। মালিকটা মনে হয় কঠিন কঞ্জুস। সার্ভিস মোটেও সন্তোষজনক নয়। তারপরেও বেশ কিছু দক্ষিণ ইন্ডিয়ান পরিবার বা নব দম্পতিদের হোটেলের লবিতে দেখেছি। বড় একটা কারণ হতে পারে মেইন রোডের ধারে। কোলাহল মুক্ত।

পরে শুনেছি যদি অনলাইনে হোটেল বুকিং করা যেত তবে অন্য সকল সুযোগ সুবিধা পাওয়া যেত। যেমন ধরুন সকালের ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। রুম রেন্টও কম পাওয়া যায়। সে যাই হোক আমিও অনলাইনে বুকিং দিয়েছিলাম সেই ফুকেট থেকে কিন্তু তার কোন আপডেট পাইনি। শেষে অপছন্দের হোটেলকে গিলতে হলো। রাতেই ঠিক হলো এই হোটেল ছেড়ে হোটেল অ্যাম্বসেডর উঠবো। যদিও পাঁচ তারকা হোটেল শুনে বুকটা কেঁপে উঠেছিল।

সকালের নাস্তা সেরে নিলাম চেইন শপে, আর আপনি সবই পাবেন খুউব সস্তায়। গতকাল হোটেল রিসিপশনিস্ট খিটখিটে স্মার্ট থাই নারী বলেছিলেন যদি সকালের নাস্তা করতে হয় তবে অতিরিক্ত ২০০ থাই বাথ গুনতে হবে আমাদের তাও আবার জন প্রতি। হিসেবটা সহজ ওদের ১ থাই বাথ সমান সমান আমাদের মুদ্রা মান ২.৭০ টাকা। বুঝে নিতে হবে কি করবেন। আমাদের কেবিনেটে পাশ হল হোটেলে থাকছি না আমরা আজ সকালেই চেক আউট করবো। এবং যাবো অ্যাম্বসেডর হোটেলে। হোক না পাঁচ তারকা হোটেল যদি কমদামী রুম মেলে। কথামত অলিখিত পারিবারিক সংবিধানের সিদ্ধান্ত ক্রমে আমরা লাগেজ গুলি রেখে দিলাম হোটেল লবিতে

দেশেই শুনেছিলাম ইন্দিরা স্কয়ারের কথা, এটি একটি শপিংমল গতকাল বিকালে গিয়ে ছিলাম ইন্দিরা স্কয়ারে। ব্যস্ততম শপিংমল। প্রথম দেখে মনে হবে যেন ঈদের আগের দিন মানে চাঁদনী রাত। এতো মানুষ। আর সব মানুষের মধ্যে ৯০ ভাগ ইন্ডিয়ান। আবার তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সাউথ ইন্ডিয়ান। কি করে বুঝলাম ? কেন গায়ের রঙ, পোষাক আর আচার আচরণে। কারণ আমরা সাউথের ছবি দেখি মাঝে মধ্যে। তাই চিনতে সমস্যা হয় না।

আমরাও মিশে গেলাম সদাই পাতির আর খদ্দেরের স্রোতে। সেকি ভুল করে ইন্ডিয়ায় চলে আসিনিতো। প্রতি ফ্লোরে বেশির ভাগ বিক্রেতা ইন্ডিয়ান নারী। সাউন্ড বক্সে চলছে ধামক্কা হিন্দি মিউজিক। সেলস্ গার্লদের পোশাকে মেকাপে গেটাপে কনফিউজড হই। নেপালী না ইন্ডিয়ান। কিন্তু ভারবাল মেমো খাবার ভয়ে দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রিত করি। পাঠক, আপনি যদি ভাল করে না দেখেন তবে লিখবেন কি বানিয়ে বানিয়ে তো আর ভ্রমণ কাহিনী হয় না।

বেশ মজাই পাচ্ছিলাম কারণ অনেক দূর দেশ নয় প্রতিবেশী দেশেই আছি। অনেক নাম ডাক ইন্দিরা স্কয়ারের অনেক আইটেমের পসরা থরে থরে সাজানো কিন্তু কোয়ালিটির বিচারে মোটেও গ্রহনযোগ্য নয়। তবুও আমাদের মত পরিবার গুলি কিনতে কিনতে ক্লান্ত। আর আমরা হাঁটতে হাঁটতে মহা ক্লান্ত। ধ্যাৎ আমারতো মনে হচ্ছিল এর থেকে গুলিস্তান বা বঙ্গবাজারেই উত্তম। যাই হোক কেনাকাটার সময় খুউব সাবধান কারণ এখানে দরাদরি চলে। একটু ঘুরে ঘুরে দেখে বুঝে কিনে নিন। ইন্ডিয়ানদের ভীড় ঠেলে আমরা এগিয়ে যাই। টুকিটাকি কেনাকাটা করতে। কিন্তু বিশ্বাস করুন। এই ঈদ বা পুজার বাজারে আমরা বড্ড অসহায়।

পরিবার প্রধানের নির্দেশ ক্রয় হবে সীমিত। বেশ তাই। প্রায় ঘন্টা তিন ঘুরেফিরে কিছু সদাই পাতি করে। ফুডপার্কে ইন্ডিয়ান খাবার খেয়ে মানে কিছু এনার্জি সংগ্রহ করে ১০০ বাথের বিনিময়ে লাল

টুকটুকে চড়ে হোটেলে ফিরে আসি। এসবই কিন্তু গতকালের কার্যাবলী।

হোটেল লবিতে বসে অপেক্ষা করছিলাম আমাদের গাড়ির জন্য। গতকাল ইন্দিরা স্কয়ার যাওয়ার আগে এই “সাফারি ওযার্ল্ড” দেখার প্যাকেজটি বুকিং বা কিনেছিলাম। পুরো পরিবার মাত্র ৩৩০০ বাথে। হোটেল থেকে পিকআপ, সারাটা দিনের প্যাকেজ, লাঞ্চ ও আবার হোটেলে ড্রপ করবে। থাই প্রবাসী বাংলাদেশী রংপুরের সুমন ভাই ম্যানেজ করে দিলেন। সুমন ভাইকে চিনে ছিলাম ফিজো ভাইয়ের মাধ্যমে। ভীষণ হেল্পফুল মানুষ। প্রবাসে এমন মানুষের বড্ড বেশি প্রয়োজন। সুমন ভাইদের কথা না আর একদিন বলবো। আজ না হয় ব্যাংককের বিখ্যাত সাফারি ওয়ার্ল্ড দেখার জন্য অপেক্ষা করি।

একটি সাদা মাইক্রোবাস এসে থামল, সেখান থেকে নেমে এলেন আমার মতই মেদযুক্ত ভদ্রলোক। ইনি চালক। গাইড অনুপস্থিত। গাড়ির ভেতরটায় দেখি একটি আর চারজন যাত্রী। তারা সবাই ইন্ডিয়ান। এক দম্পতি মুম্বাইয়ের অপরজন কলকাতার। মুম্বাইয়ের পরিবারটির সাথে ছোট্ট এক কন্যাশিশু। বয়স কত হবে তিন চার। আর কলকাতার দম্পতির সাথে একটা ফাস্টফুড তরুণ। লেখাপড়া করে বেঙ্গুলরে। সেই তার বাবা মাকে ম্যানেজ করে নিয়ে এসেছে ।

বাঙালি ভদ্রলোক আমাদের পেয়েতো ভীষণ খুশি। জানলাম তিনি ইন্ডিয়ান সরকারি জব্ করেন। আহা তার মুখেও শুনি ব্যাংককের প্রশংসা। জয়তু ব্যাংকক। গাড়ি এগিয়ে চলে আমরাও উঁকিঝুকি দেই আর কতদূর।

মিনিট দশেক পর বাঙালি ভদ্রলোক তিনি জিঞ্জেস করলেন

– দাদা একটা প্রশ্ন করব

– বলুন

– মনে কিছু নিবেন না মানে আপনাদের কত পড়ল

– কি

– মানে প্যাকেজ ট্যুরের খরচ।

– ৩৩০০ বাথ আপনার

– ঐ আমার ছেলেই সব করেছে অনলাইনে, তবে রেটটা একটু বেশি আপনারা চারজনের ৩৩০০ বাথ আমাদের তিনজনের ৩৫০০ বাথ।

বলেই বেচারা একটু চুপসে গেলেন, মনে হল দুশো বাথের ব্যাথায় সে আহত হলো।

কিরে বাবা ঢাকার রাস্তা নাকি গাড়িতে আটকে গেল বলি এখানেও জ্যাম।

গাড়ি চলছে না কোনো সমস্যা নেই ওটা আমাদের অভ্যাস আছে। মে মাসের গরমে না হলে সেদ্ধ হতে হতো। নাহ এরা আমাদের মতো ধৈর্যশীল না এদের জ্যাম মাত্র দশ মিনিট আর আমরা ঘন্টা পর ঘন্টা।  (চলবে)

লেখকঃ মাহাতাব লিটন, প্রজেক্ট ম্যানেজার, WMPL