নিউ ইয়র্ক যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ৪

NewYork 4

সৈয়দ আলমাস কবীর: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে সফরে আসলে সবসময়ই তক্কে তক্কে থাকতে হয়, যে কখন বুঝি ডাক পড়ে কোন মিটিং-এর জন্য। হঠাৎ জানলাম, যেতে হবে এক মিটিং-এ, যেখানে বৃহত্তর নিউ ইয়র্কের ব্যবসায়ীবৃন্দ কথা বলবেন আমাদের সাথে। কী করে দু’দেশের মধ্যে ব্যবসায় বাড়ানো যায়, কী করে বাণিজ্য-ঘাটতি কমিয়ে আনা যায়, ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হবে। মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের এই ঘাটতি প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। এবং সেটা বাংলাদেশের পক্ষে! প্রধান কারণ হলো, আমরা যে পরিমাণ পোষাক-পরিচ্ছদ আমেরিকায় পাঠাই, সে তুলনায় তত কিছু আমরা কিনি না ওদের থেকে।

 বেশীভাগ দেশের ক্ষেত্রেই এই পরিসংখানটি উল্টো। তাই মার্কিনীরা অতিমাত্রায় আগ্রহী আমাদের কাছে ওদের জিনিসপত্র বিক্রী করার ব্যাপারে। আমার কেন জানি মনে হয়, এসব মিটিং করে কিস্যু হয়না। সৌজন্য বিনিময়, ভাল ভাল দু-চারটে কথা বলা, আর হ্যাঁ, ছবি তোলা – এ পর্যন্তই। এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরী অংশটি হলো শেষেরটা। পিআর (প্রেস রিলিজ, পাবলিক রিলেশন্‌স) দিয়েই বেশীভাগ মানুষ ভেজে খাচ্ছে! আমিও বাদ যাইনা এথেকে। যস্মিন দেশে যদাচার, কাছা খুলে নদী পার!

আজ সন্ধ্যায়ও আরেক দল বাংলাদেশীদের আয়োজিত অনুষ্ঠান রয়েছে। গতকাল ছিল বাবা’র প্রোগ্রাম, আজ হলো আব্বা’র। অর্থাৎ, আমেরিকান বাংলাদেশী বিজনেস অ্যালায়েএন্স। এখানেও রীতির ব্যতিক্রম হলো না। অর্থাৎ অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরী হলো। সেদিনের মত আজও প্রায় দু’ডজন বক্তা। তাঁদের স্টেজে বসতে না দিলে অসম্মান করা হবে; তাই স্টেজ জুড়ে বসেছেন আব্বা’র নেতৃবৃন্দ। এদেশে কয়েক দশক থেকেও অনেকেই নিজেদের পুরোনো অভ্যাসগুলোর উর্দ্ধে উঠতে পারেন না, বা নিজেদের কাজেকর্মে এদেশের উত্তম রীতি-রেওয়াজগুলোর উপযোজন করতে পারেন না। এর বোধহয় প্রধান কারণ হলো, এঁরা সামাজিকভাবে শুধুমাত্র নিজের দেশের লোকেদের সাথেই মেশেন। তাই ঘুরে-ফিরে সেই আদি অভ্যাস বা চিন্তা-চেতনাগুলোই রয়ে যায়; নতুন চিন্তা, নতুন রীতি আর গৃহীত হয় না।

দলাদলিটা একটা বড় সমস্যা বিদেশের মাটিতে। এমনিতেই অভিবাসীগণ এখানে সংখ্যালঘু, মূলধারার বাইরে। সেখানে যদি আবার বিভক্তি থাকে, তা’হলে সম্প্রদায় বা গোষ্ঠি হিসেবে উন্নতি করাটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যাইহোক, ‘আমরা সবাই রাজা’ মনোভাব নিয়েও প্রবাসী বাংলাদেশীরা এখন আস্তে আস্তে উন্নতি করছেন, কয়েকজনের সাথে কথা বলে তা’ মনে হলো। কয়েকজন উকিল পেলাম, যাঁরা শুধু অভিবাসন নয়, সব ধরণের কেস নিয়ে কাজ করছেন। কিছু রিয়েল এস্টেট এজেন্ট পেলাম, কিছু আমদানীকারক, কিছু গাড়ী-ব্যবসায়ীও পেলাম। আমার মনে হয়, বছর দশেক আগেও এত প্রবাসী বাংলাদেশী এত রকমের ব্যবসায়ের সাথে যুক্ত ছিলেন না।

বিশেষ করে খুব ভাল লাগলো দু’জন ব্যক্তির সাথে পরিচিত হয়ে। একজন মহিলা, আরেকজন পুরুষ, দু’জনেই আগামী ২০২০ সাধারণ নির্বাচনে নিজ নিজ এলাকা থেকে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। একজন তো এখন থেকেই নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিয়েছেন এবং অর্থ সংগ্রহ করছেন। তাঁদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে যে, এতদিনে প্রবাসীদের মধ্যে একটা সঠিক চিন্তা-চেতনা আসা শুরু করেছে। এতকাল সবসময়ই দেখেছি যে যাঁরা প্রবাসে থাকেন, তাঁরা দু’নৌকায় পা দিয়ে রাখেন। সবসময়ই তাঁরা মনে করতে থাকেন, এই প্রবাস তো’ সাময়িক ঠিকানা, ছেলেমেয়ে একটু বড় হলেই দেশে চলে যাব। এজন্য তাঁরা নিজেদেরকে এখানকার সমাজে জড়িত করেন না। দুঃখের বিষয়, তাঁদের সেই দেশে যাওয়ার আশা আর পূরণ হয় না। না ঘরকা, না ঘাটকা হয়ে সারা জীবন কেটে যায়। যাঁরা প্রবাসকে নিজ দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাঁ’দের উচিত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেই দেশের মূলধারার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যাওয়া। তা’হলে তাঁদের উন্নতি হতে বাধ্য।

আমার বক্তৃতায় আবারও আমি প্রবাসীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে উন্নয়নের অগ্রযাত্রার আংশীদার হতে আহ্‌বান করলাম। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ে ডলার বিনিয়োগ করে কী করে সরকারী সহযোগিতা পাওয়া যায়, সে পথ বাত্‌লে দিলাম। নিজেদের বা বন্ধুবান্ধবের প্রতিষ্ঠানের ছোটখাট কাজ বাংলাদেশ থেকে করিয়ে নিলে কতটা লাভবাল হবেন তাঁরা, সেটাও বললাম।

অনুষ্ঠান শেষ করে গেলাম টাইমস্‌ স্কোয়ারে। আগেও বলেছি, আমার মনে হয়, পবিত্র মক্কার হারাম শরীফ আর নিউ ইয়র্কের টাইমস্‌ স্কোয়ার হলো এমন দুই জায়গা, যেখানে দিনরাত সবসময়ই মানুষের ঢল। দুই স্থানেই মধ্যরাতেও আলোয় আলোয় দিন হয়ে থাকে। কিন্তু দু’টো সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী, একটার মধ্যে আছে পবিত্রতা আর শান্তি, অন্যটার মধ্যে আছে মাতন আর উত্তেজনা। নিউ ইয়র্কের ৭ম এভিনিউ আর ব্রডওয়ে যেখানে একে অপরকে অতিক্রান্ত করেছে, সেই জায়গাটিই টাইমস্‌ স্কোয়ার। এলইডি বাতি দিয়ে তৈরী বিভিন্ন সাইনেজ আর অতিকায় পর্দায় সারাক্ষণ চলতে থাকা নানান বিজ্ঞাপন জায়গাটাকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে রাখে। এর কিছুটা অংশে গাড়ী চলাচল বন্ধ করে পথচারীদের জন্য একটা চত্ত্বর করা হয়েছে। সেই চত্ত্বরে গল্প-সিনেমার বিভিন্ন চরিত্রের সাজ নিয়ে কতরকম মানুষ ঘোরাফেরা করছে! তা’দের সাথে পর্যটকরা ছবি তুলছে পয়সার বিনিময়ে। কেউবা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রতিবাদ করছে। আবার কেউ কিছুটা জায়গা করে নিয়ে খেলা দেখাচ্ছে। এত হৈ চৈ-এর মধ্যেও কেউ বা আবার লিফলেট বা চটি বিলি করে ধর্ম প্রচার করছে! এ জায়গার আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, এর আশেপাশের রাস্তাগুলোয় চলছে নামকরা সব থিয়েটার। ব্রডওয়ের বিখ্যাত নাটকপাড়া হচ্ছে এটা। বিশ্বখ্যাত থিয়েটার-তারকাদের মক্কা এই ব্রডওয়ে।

দু’দশক আগেও টাইমস্‌ স্কোয়ারের সাথে লাগানো রাস্তাগুলো ছিল বেশ অন্ধকার আর নোংরা। মাদক, পতিতাবৃত্তি ইত্যাদি চলতো সমান তালে। একটু অন্ধকার জায়গা পেলেই পর্যটকদের ঠেক্‌ দিত মাস্তানদের দল। রুডি জুলিয়ানি মেয়র হবার পর এই সবকিছু ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন।

টাইমস্‌ স্কোয়ারে কিছু না করে বসে থাকতেও বেশ ভাল লাগে আমার। মাথা উঁচু করে চেয়ে চেয়ে দেখি পুঁজিবাদের জয়ধ্বণি। এত চাকচিক্যের মধ্যেও মাঝে মাঝে চোখে পড়ে দারিদ্র্য। গৃহহীন মানুষ ভিক্ষার থালা নিয়ে বসে আছে দু’টো পয়সার জন্য। ধনতন্ত্রের এই পিঠটা অনেকেই দেখতে পায় না। এরই মাঝে দেখলাম কাশ্মীরের স্বাধীনতার পক্ষে লেখা বিজ্ঞাপন, একেবারে প্রধান এলইডি পর্দায়!

ঘন্টাখানেক বসে, হাঁটাহাঁটি করে ঘরে ফেরার মনস্থ করলাম। নিউ ইয়র্কের রাস্তায় রাস্তায় ঠেলাগাড়ীতে বিক্রী হয় হটডগ আর কাবাব। আগে এগুলো খেতাম না, কারণ সেগুলো ছিল শুয়োরের মাংসের তৈরী। এখন এই সব ঠেলাগাড়ীগুলো হয় আফগান/তুর্কী/লেবানীজ না হয় বাংলাদেশীদের দখলে। তাই এরা বিক্রী করে গরুর মাংসের হটডগ আর মুরগীর মাংসের কাবাব। কোথাও আবার মধ্যপ্রাচ্যের শর্মা, ফালাফেলও পাওয়া যায়। একটা হটডগ আর এক শিক কাবাব নিয়ে খেতে খেতে গাড়ীতে চড়লাম। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।