নিউ ইয়র্ক যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ৫

NewYork 5

সৈয়দ আলমাস কবীর: আজ সেই প্রতিক্ষীত দিন, যেদিন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসঙ্ঘের ৭৪র্থ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। সকাল ১০টায় আরেকটি অনুষ্ঠান রয়েছে, সেখানেও প্রধানমন্ত্রী কথা বলবেন। ৭ঃ৩০টার মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম ম্যানহ্যাটনের দিকে। যদিও এক ঘন্টার বেশি লাগার কথা না, কিন্তু বলা তো যায় না, সকালবেলা এক্সপ্রেসওয়ে-গুলোতে প্রচণ্ড ভীড় হয়। তা’ছাড়া ম্যানহ্যাটনের মধ্যে রাস্তাঘাটের এখন যে অবস্থা! পার্কিং গ্যারেজ খুঁজতেই অনেক সময় লেগে যাবে।

যা ভেবেছিলাম তাই! এক ঘন্টার পথ প্রায় দেড় ঘন্টায় পৌঁছে ছয় ব্লক দূরে পার্কিং করলাম। সকাল ১০টার আগে গ্যারেজে ঢুকাতে পারলে ভোরের পাখির ছাড় বা ‘আর্লি বার্ড স্পেশাল’ পাওয়া যায়। তা’ নাহলে তিনগুণ ভাড়া গুণতে হয়। গাড়ী গ্যারেজওয়ালার জিম্মায় দিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম আবার ৪৬ষ্ট স্ট্রীট আর ২য় অ্যাভিনিউর উদ্দেশ্যে। একটু পর পরই থামিয়ে পুলিশ পাস ও পরিচয়পত্র দেখতে চাচ্ছিল। প্রধান কার্যালয়ে ঢুকবার মুখে, নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে ঘড়ি, মানিব্যাগ, মোবাইল, বেল্ট বিসর্জন দিয়ে, সেগুলোকে শুচি করে, নিজেকে বেকসুর প্রমানিত করে তবে প্রবেশ করলাম জাতিসঙ্ঘে।

আবার সেই সম্মেলন কক্ষ নং ১। এখানে আজ টেকসই সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক একটি সেমিনার হবে। বাংলাদেশ ও ভুটানের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় এবং নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন ও আলোচনায় অংশ নেবেন। দ্বিতীয় অংশটি পরিচালনা করবেন প্রধানমন্ত্রী-কন্যা সায়মা, যেখানে বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞগণ বিবৃতি দেবেন। শুরুতেই দেখানো হলো একটি তথ্যচিত্র। এখানেও প্রসংশিত হলো স্বাস্থ্যসেবায় নেয়া বাংলাদেশের কিছু জরুরী পদক্ষেপ। প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক এর একটা বড় উদাহরণ। একে একে সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ বক্তব্য রাখলেন। জানতে পারলাম, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী একসময়ে বাংলাদেশে ডাক্তারী পড়তেন। সাড়ে বারোটায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য বৈঠক ছিল। তাই কিছু আগে চলে গেলেন তিনি। সেমিনার শেষে বেশ খিদে লেগে গেল। ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে দেখি নানান পদের নানান দেশী খাবার। জাপানী সুশি খেতে মন চাইলো। দেখলাম সুশির বাক্সটা কাগজের। ছুরি-কাঁটা-চামচ পাতলা কাঠের তৈরী; আর পানি বিক্রী হচ্ছে কাগজের বাক্সে। বুঝলাম, প্লাস্টিকের ঠাঁই নেই এখানে! সবই জীবাণুবিয়োজ্য ও পরিবেশবান্ধব। হতেই হবে! পরিবেশ-পরিবেশ করে জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন দপ্তর সারাক্ষণ যেখানে গলা ফাটিয়ে ফেলছে, সেখানে তা’দেরই অফিসে একক-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কথা তো’ চিন্তাই করাটাই মহাপাপ!

পেটকে একটু ঠাণ্ডা করে ভাবলাম জাতিসঙ্ঘের কার্যালয়টা খানিকটা ঘুরে দেখা যাক। বাইরে বেরুনো যাবে না, যদি আবার না ঢুকতে দেয়। তাই লিফটে করেই দো’তলা-চারতলা সব ঘুরে দেখলাম। দো’তলার পূর্বদিকের একটি বড় হলঘরে দেখলাম জুম্মার জামাতের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ যে শুক্রবার, খেয়ালই ছিল না! পুরো দেওয়াল জুড়ে কাঁচ, আর কাঁচের জানালার ধারে দিয়েই ইস্ট রিভার। এই মনোরম পরিবেশে নানান দেশ থেকে আসা মুসলমান প্রতিনিধিগণ প্রার্থনা করছেন। বেজমেন্টে রয়েছে বইয়ের দোকান। একটা মনোহারী শিল্পবস্তুর বিপণীও আছে সেখানে। বিভিন্ন দেশের হরেক রকম হস্তশিল্পের কাজ বিক্রী হচ্ছে এখানে। বাংলাদেশের অবশ্য কিছু পেলাম না। আমাদের জাতিসঙ্ঘ মিশনের কর্মকর্তাগণ আরেকটু করিতকর্মা হলেই হয়তো এখানে আমাদের দেশীয় শিল্পকর্মের স্থান হতো। নানাপদের স্মৃতিবস্তুও পাওয়া যাচ্ছে এখানে। জাতিসঙ্ঘের লোগোর একটা বোতাম আর ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের লোগোর একটা স্মারক বোতাম কিনলাম নিজের সংগ্রহের জন্য। বইয়ের দোকান থেকে ভাবলাম প্রোটকল বা দফতরের আদব-কায়দা বা চালচলন সম্পর্কিত আচরণবিধির উপর লেখা একটা সারগ্রন্থ কিনবো। এই করতে করতে বিকেল হয়ে এল।

রাষ্ট্রপ্রধানগণ তাঁ’দের ভাষণ দেওয়া শুরু করেছেন প্রধান সভাঘরে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও দেবেন শীঘ্রই। তাই ঠিক করলাম সেখানে গিয়ে আসন গ্রহণ করি। লিফটের চারে উঠে কাঁচের দরজা পেড়িয়ে ঢুকলাম মহান জাতিসঙ্ঘের প্রধান সমাবেশস্থলে। এখানেই সেই মঞ্চ, যার পেছনে রয়েছে সেই সবুজ গ্র্যানাইটের দেওয়াল। আসলে এই দেওয়ালটি হলো আরেকটি ছোট মঞ্চের সামনের অংশ, যার উপরে বসেন জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব, এবারের অধিবেশনের সভাপতি এবং সহ-সভাপতিবৃন্দ। এই সবুজ গ্র্যানাইটকেই পশ্চাৎপট বানিয়ে, এই মঞ্চ থেকেই পৃথিবীর সব বড় বড় নেতারা বক্তৃতা দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডী, রুশ প্রেসিডেন্ট ক্রুশ্চেভ থেকে শুরু করে ইয়াসীর আরাফাত, আমাদের বঙ্গবন্ধু, নেলসন ম্যাণ্ডেলা এমনকি লিবিয়ার গাদ্দাফী, কত নেতা যে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলেছেন! আজ সচক্ষে সে জায়গাটা দেখে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। এখানটাতেই একটু পরে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্য রাখবেন। মজার ব্যাপার হলো, এতবড় সভাঘরে বক্তৃতা চলছে, কিন্তু তেমন কোন আওয়াজ নেই সেখানে। অনেকটা পিন-পতন নিরবতাও বলা চলে। উপস্থিত সকলে কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে বক্তব্য শুনছেন। মোট ৭টি চ্যানেলে আরবী, চীনা, ইংরেজী, ফরাসী, রাশিয়ান এবং স্প্যানিশ এই ৬টি ভাষায় তাৎক্ষণিক অনুবাদসহ বক্তব্যগুলো প্রচারিত হচ্ছে। ৭মটিতে মূল ভাষ্যটি শোনা যাচ্ছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতা শেষ করলেন। বরাদ্দকৃত সময়ের একটু বেশীই নিলেন তিনি। একে একে আরও অনেক ক’টা দেশের নেতৃবৃন্দ আসলেন। একসময়ে আসলেন পরম শ্রদ্ধাভাজন মাহাথির মোহাম্মদ। ৯৩ বছর বয়সী এই বর্ষিয়ান নেতা অনেকটা অভিভাবকের ভূমিকায় বক্তব্য রাখলেন; জাতিসঙ্ঘের ৫ মোড়লের ভেটো-অধিকারের তীব্র সমালোচনা করলেন বক্তৃতায়। না দেখে, না পড়ে উপস্থিতমত যে বক্তৃতা দিলেন, তা’ আরেকবার প্রমাণ করে দিল কেন মালয়শিয়ার মানুষ আবার এই বয়সে তাঁকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান বানিয়েছে।

এবার এলেন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগে থেকে তাঁর বিশেষ সুরক্ষাকর্মীরা আমাদের অনুরোধ করে গিয়েছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মাঝে কেউ যেন হাততালি বা শ্লোগান না দেয়। কিন্তু, আমাদের নিজেদের প্রধানমন্ত্রীকে খোদ জাতিসঙ্ঘের মুলমঞ্চে দেখে সবার অজান্তেই হাততালি দিতে শুরু করলাম আমরা। বঙ্গবন্ধুকে অনুসরণ করে বাঙলাতেই ভাষণ দিলেন তিনি। বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলা অর্থনীতি ও সামগ্রিক সম্মৃদ্ধির কথা, রোহিঙ্গা-সমস্যা, পরিবেশ-দূষণ ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করলেন তিনি। সুরক্ষাকর্মীদের অনুরোধ উপেক্ষা করে মাঝে মাঝেই হাততালির ঝড় উঠছিল। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শেষ হলে আবারও সরবে হাততালি ও সাধুবাদের বন্যা বয়ে গেল। আমাদের ছবি তোলার ধুম দেখে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তাকর্মীদের অসন্তুষ্টির উদ্রেক হলো। সবাইকে ক্যামেরা বন্ধ করে চলে যেতে বললেন তা’রা। যুক্তি দিলেন, আপনাদের নেতার বক্তব্য শেষ, এখন আর থেকে কী করবেন! বললাম, অন্য নেতাদের কথাও তো শুনতে চাই। কানে নিলেন না সে কথা। অগত্যা বেরিয়ে আসলাম মূল সভাঘর থেকে।

সেই সকাল থেকে আছি এখানে। ক্লান্ত লাগছিল বেশ। তারপরও আরেকটু ঘুরে-টুরে, কয়েকটা ছবি তুলে জাতিসঙ্ঘের প্রধান কার্যালয় ভবনটিকে স্মৃতিতে আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করলাম। আর কখনও আসতে পারবো কি না কে জানে! অবশেষে বেড়িয়ে পড়লাম ২য় অ্যাভিনিউতে। গাড়ী রাখা আছে বেশ দূরে। ২৭ ডলারের বিনিময়ে গাড়ী ফেরৎ নিয়ে ভাবতে থাকলাম কোথায় খেতে যাওয়া যায়। গত প্রায় মাস খানেক ধরে দেশের বাইরে এই উত্তর আমেরিকায় রয়েছি। আর এদেশে থাকা মানেই খাদ্যতালিকায় মাংসের প্রাদুর্ভাব। গত কয়েক সপ্তাহে যত মাংস খেয়েছি, স্বয়ং বনের রাজাও বোধহয় তত খান না! শরীরটাকে গরলমুক্ত করতে হবে নিরামিষ খেয়ে। আর নিরামিষ-ভোজনের সেরা হলো দক্ষিণ ভারতীয় রান্না। ‘সারাভানা ভবন’ নামের নামকরা এক দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তোরাঁ রয়েছে কাছেই, লেক্সিংটন অ্যাভিনিউতে। চলে এলাম সেখানেই। ভারতসহ ২৪টি দেশে ছড়িয়ে আছে এদের শাখা। শুধু এই যুক্তরাষ্ট্রেই আছে ১৩টি। দ্বাদশপদের থালি খেয়ে মাংসাশী হওয়ার অপরাধবোধটা কিছুটা নিরসন করলাম।

এবার ঘরে ফেরার পালা! কাল দুপুর নাগাদ নিউ ইয়র্ক ত্যাগের উদ্যোগ নিলাম। বাক্স-পেটরা ঘুছিয়ে তৈরী আমি। শুধু গাড়ীটা ফেরৎ দিতে হবে, বাকী সবই প্রস্তুত।

“যাবার দিনে এই কথাটি, বলে যেন যাই – যা দেখেছি যা পেয়েছি তুলনা তার নাই।

এই জ্যোতিঃসমুদ্র-মাঝে যে শতদল পদ্ম রাজে, তারি মধু পান করেছি ধন্য আমি তাই!”

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।