পাখির কলকাকলি আর ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত সোনারচর।

মোঃ সাইফুল ইসলাম,পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি : প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় পর্যটন কেন্দ্রগুলো অন্যসব ঋতুর তুলনায় শীতে বেশি সজ্জিত থাকে। পর্যটকরাও ভ্রমণের জন্য বেছে নেয় এ সময়কে। এই শীতেও ডানা মেলেছে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা সোনারচরের প্রকৃতি। দ্বীপটিতে উড়ে আসা অতিথি পাখিদের কলকাকলি সমুদ্র সৈকতের অপরূপ শোভাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। অতিথি পাখির কলরব আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে সোনারচরের পরিবেশ। সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউগুলোও কোনো চিত্রশিল্পীর রঙ তুলির পরশ মনে হয়। ফেনিল নোনা জলে ভেজা তটরেখায় চলে লাল কাঁকড়াদের ছোটাছুটি। সামান্য দূরেই ঝাউ বাগানের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বাতাসের শোঁ শোঁ আওয়াজ।

ঝাউ গাছের ঝরা পাতাগুলো শুকনো বালুর ওপর যেন কার্পেটের নরম বিছানায় পরিণত হয়ে আছে। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের যাবতীয় আয়োজন রয়েছে এ দ্বীপটিতে। নদী আর সাগরের জল আছড়ে পড়ছে এ দ্বীপের চারপাশে। সোনার চরের চিকচিক বালুতে যেন ভোরের কোমল সূর্য আলো ছড়ায়। অস্তগামী সন্ধ্যার লালিমা তেমনি মায়া ঢালে নিভৃতে। অপরূপ সোনারচর স্বর্ণালী স্বপ্নের মতোই বর্ণিল শোভায় ঘেরা। অন্তত একবার এসে ঘুরে দেখুন দেশের ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দ্বীপটিকে।আয়তন ও আকৃতি: ভূ-খণ্ড পরিমাপের হিসাবে সোনারচরের আয়তন ১০ হাজার একর। চরটি দেখতে অনেকটা বাদামের দানার আকৃতির মতো।

সোনারচর ও এর পার্শ্ববর্তী চর আন্ডার মাঝখানে একসময় বড় নদী ছিল। চর পড়ে সে নদী এখন ছোট হয়ে গেছে। শুকনো সময়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। সোনারচর চ্যানেল সরু হয়ে গিয়ে বনের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়াও অগণিত চ্যানেল রয়েছে সোনারচরের আশপাশে। পর্যটকরা ঘুরতে পারেন নৌকা অথবা ট্রলার নিয়ে। চ্যানেলের দুই পাশ জুড়ে বহু পুরনো ম্যানগ্রোভ আর ঝাউ বন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি চরের কোল ঘেঁষে অবস্থান মৌসুমি জেলে ও জেলে শ্রমিকের। এই শীত মৌসুমে নানা স্থান থেকে ব্যবসার জন্য এই চরটিতে আশ্রয় নেয় অগণিত জেলে।

যাওয়ার পথ: প্রথমে পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে গলাচিপা উপজেলায় পৌঁছাতে হবে যেকোনো দর্শনার্থীকে। সেখান থেকে যেকোনো ভাড়া মোটরসাইকেল বা অন্য মাধ্যমে পৌঁছাতে হবে আগুনমুখা নদীর মোহনায়। আগুনমুখার তীরে পৌঁছালে বুড়াগৌরাঙ্গ ও দাঁড়ছিড়া নদী পাড়ি দিতেই দু’পাশ জুড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ বনের দৃশ্য  যে কারো মনকে দ্বিগুণ প্রাণবন্ত করে তুলবে। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখার মোহনা থেকে ঘণ্টা দুয়েক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপ ‘চর তাপসী’। তাপসীর দুই পাশ জুড়ে বিরল দৃশ্য অতিক্রম কালেই সোনারচরের হাতছানি।

তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ দক্ষিণে এগুলেই সোনারচর। স্পিডবোটের ব্যবস্থা রয়েছে। বিত্তবানরা যেতে পারেন স্পিডবোট নিয়েও। এ ছাড়াও রয়েছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে সোনারচর যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। রাঙ্গাবালী উপজেলা সদর থেকে স্পিডবোটযোগে সোনারচরে পৌঁছাতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগবে। আবার কুয়াকাটা থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সোনারচরে যাওয়া যায়।

থাকার জায়গা: সোনারচরে রাত যাপনের জন্য নিরাপদ আরামদায়ক ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। তবে, প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট্ট তিন কক্ষের একটি বাংলো। রয়েছে বন বিভাগের ক্যাম্প। এসব স্থানে রাতে থাকার সুযোগ রয়েছে। চাইলে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা ট্রলারে মাত্র আধাঘণ্টার মধ্যে চরমোন্তাজ ইউনিয়নে গিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে।

সেখানে রয়েছে বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা স্যাপ বাংলাদেশ ও মহিলা উন্নয়ন সমিতির বাংলো। সরজমিন সোনারচরের নিকটবর্তী একটি বাজারে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপচারিতা সম্ভব হয়। তাদের দাবি একটাই, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এই চরের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে হবে। সোনারচরকে পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে তারা বলেন, যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে এটি হবে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পর্যটকদের ভিড় জমবে।

পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারেন। পর্যটকরা সোনারচরের পাশেই জাহাজমারা, তুফানিয়া ও শিবচরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। জানতে চাইলে পটুয়াখালী-৪ (রাঙ্গাবালী-কলাপাড়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মহিব্বুর রহমান মহিব বলেন, দক্ষিণাঞ্চলকে নিয়ে সরকারের মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে। এখানকার পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সোনারচরকে পর্যটনশিল্পে যোগ করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। অতি শিগগিরই আমরা সুসংবাদ দিতে পারব