প্যারী-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ২

Pari 2

সৈয়দ আলমাস কবীর: চার্লস্‌ দ্য গ্যল বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম ঠিক রাত আটটায়। ল্যাপটপ সমেত কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে বিমান থেকে বেরিয়েই দেখি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশ এম্ব্যাসীর এক কর্মচারী; হাতে ‘স্বাগতম’ লেখা প্ল্যাকার্ড। পরিচয় দেওয়াতে বেশ গদগদ হয়ে আমার ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে হাঁটা দিলেন কাঁচাপাকা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-বিশিষ্ট মাঝবয়সী মাফ্‌লার জড়ানো ভদ্রলোকটি। অভিবাসন জানালায় সময় লাগলো ঘড়ি ধরে তিরিশ সেকেণ্ড। এরপর আমার স্যুটকেস ফেরৎ নিয়ে আগমনী হলে পৌঁছে দেখি এমিরেট্‌স-এর গাড়ীর ড্রাইভার একটি আইপ্যাডে আমার নামটি বড় অক্ষরে লিখে সেখানে অপেক্ষামান। এম্ব্যাসীর লোকটিকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, এরাই আমাকে হোটেলে নামিয়ে দেবে, তাই তাঁর আর গাড়ীর ব্যবস্থা করার দরকার নেই। তিনি উল্টো আমায় অনুরোধ করে জিগ্যেস করলেন আমি তাঁকে পথে নামিয়ে দিতে পারবো কিনা।

প্রায় একঘন্টা বাদে হোটেল পৌঁছে দেখি, একেবারে আইফেল টাওয়ারের পাশেই এর অবস্থান। প্যারী শহর তথা সমগ্র ফরাসী দেশের আইকন এই আইফেল টাওয়ার। কত প্রেমকাহিনী রচিত হয়েছে একে ঘিরে! একটা সময় ছিল, যখন রোমান্টিক সিনেমা মানেই ফরাসী পটভূমি আর এই আইফেল টাওয়ারে চড়ে প্রেমিক-প্রেমিকার প্রেম প্রদর্শন। ১০৬৩ ফুট উঁচু এই ১৩০ বছরের পুরোনো স্থম্ভটি তৈরী হয়েছিল ১৮৮৯ সালের বিশ্বমেলার তোরণ হিসেবে। কালের বিবর্তনে পৃথিবীর সবচেয়ে সহজে চিনতে পারা কাঠামোগুলোর অন্যতম হয়ে ওঠে এই টাওয়ার। এখন প্রতিদিন সন্ধ্যে থেকে রাত ১টা পর্যন্ত আলোকিত করে রাখা হয় এটিকে। আর প্রতি ঘন্টায় আলোর ঝিকিমিকি খেলা চলে মিনিট পাঁচেকের জন্য। এমনিতে দিনের বেলা কাছ থেকে এটিকে দেখতে খুবই সাদামাটা – লোহা-লক্করের তৈরী একটা সাধারণ টাওয়ারের মতই। কিন্তু, তা’ও কী যেন ব্যাপার আছে একটা এর মধ্যে! সেই ছোটবেলা থেকে আগ্রার তাজমহল, মিশরের পিরামিড, নিউইয়র্কের স্ট্যাচ্যু অফ লিবার্টি, জাপানের মাউন্ট ফুজি, সিডনীর অপেরা হাউস, রোমের কলোসিয়াম, পিসা-র হেলানো টাওয়ার ইত্যাদি পৃথিবীর সব দর্শণীয় স্থান বা দালানগুলোর মধ্যে অন্যতম এই আইফেল টাওয়ার। সেই টাওয়ারকে এত কাছে থেকে দেখে আবারও গায়ে কাঁটা দিল। ‘আবারও’ বললাম, তা’র কারণ হলো, এই আইফেল দর্শনের সুযোগ আমার কপালে আগেও জুটেছিল। বন্ধুবান্ধব ও পরিবারবর্গ নিয়ে এদেশে এসেছিলাম পঁচাশত্তম জন্মদিন উদ্‌জাপনের জন্য। তখন ক’দিন এখানে থেকে মন ভরে উপভোগ করেছিলাম প্যারী শহরটিকে। এবারে তো উপরোধে ঢেঁকি গিলে আসা, খুবই সংক্ষিপ্ত সফর; তাই আমার পূর্ব অভিজ্ঞতার কথাও ডায়েরীতে এসে যাবে হয়তো মাঝেমাঝে।

চেক-ইন করে ঘর বুঝে পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখি অসাধারণ এক দৃশ্য। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে প্যারী শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সীন নদী। আর সামনে যে সেতুটি রয়েছে, তা’র সাথেই বসানো আছে ফরাসী স্ট্যাচ্যু অফ লিবার্টি। নিউ ইয়র্কের স্ট্যাচ্যু অফ লিবার্টি-টি ছিল মার্কিনীদের দেয়া ফরাসী উপহার যার দৈর্ঘ্য ৩০৫ ফুট। এরই প্রতিদানে তিন বছর বাদ মার্কিনীরা একই মূর্তির প্রতিরূপ উপহার হিসেবে দেয় ফরাসীদের ১৮৮৯ সালে। তবে এর দৈর্ঘ্য মূল মূর্তির চারভাগের একভাগ। সীন নদীর ওপর নিউ ইয়র্কের দিকে তাকিয়ে আছেন এই ফরাসী লেডী লিবার্টি।

হাতমুখ ধুয়ে যখন বেরুলাম, তখন ইল্‌শে গুড়ি শুরু হয়েছে। ভাগ্যিস, যে জ্যাকেটটা এনেছি সেটা জল-নিরোধক। মাথা ঢেকে হাঁটতে থাকলাম আইফেল টাওয়ারের দিকে। হঠাৎ টাওয়ার জুড়ে শুরু হয়ে গেল আলোর ঝিকিমিকি খেলা। বুঝলাম এগারোটা বাজলো। সামনে রাস্তার মোড়ে রয়েছে একটি রেস্তোরাঁ। স্থির করলাম নৈশভোজটা এখানেই সেরে নেব। স্বাগতিক রেস্তোরাঁ-কর্মী জিগ্যেস করলেন ভেতরে বসবো, নাকি বাইরে ফুটপাথে। বলে রাখি, ফুটপাথে বসে খাওয়াটা ইউরোপে বেশ জনপ্রিয়। শীতকাল বাদে অন্যসময়ে ফুটপাথে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে খাওয়া-দাওয়া করাটা শুধু আনন্দদায়কই নয়, একটা স্টাইলও বটে। আমাদের দেশে কোন রেস্তোরাঁ-কর্মী এই কথা বললে অতিথি শুধু অপমানিতই হবেন না, তেড়েও আসতে পারে্ন! যা’হোক, যদিও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল, তবুও ফুটপাথের উপর ক্যানোপী বা ত্রিপল দেওয়া থাকায় বললাম সেখানেই বসবো। রাস্তা দিয়ে কোন রকম হর্ণ না বাজিয়ে গাড়ী চলছে, মাথার উপর দিয়ে নিঃশব্দে ট্রেন যাচ্ছে, আর সামনেই আলোকিত হয়ে আছে সুবিশাল আইফেল টাওয়ার। প্রশস্ত ভেজা রাস্তার উপর গাড়ীর সাদা-লাল আলোর প্রতিবিম্ব অদ্ভুত এক আলোকচ্ছটার সৃষ্টি করছে। এমন একটা পরিবেশে রাতের খাবার খেতে বেশ পুলকিত লাগছিল।

 কী খেলাম সেটা যদি শুনতে চান, তা’হলে অবশ্য রুচির পরীক্ষা দিতে হবে! কাগজের মত খুব পাতলা করে কাটা কাঁচা গরুর মাংসের উপর জলপাই-তেল আর মোজ্জারেলা পনির ছড়ানো যে পদটি দিয়ে ভোজন শুরু করলাম, তা’র নাম হলো কার্পাচিও। এছাড়াও নিলাম গরুর মাংস দিয়ে তৈরী পেপারণি আর পনির দেওয়া পিৎজা। পথের ধারে একলা বসে অনেক সময় নিয়ে খেলাম তিনজন-পরিমাণের খাবার। এর মধ্যেই এক পশলা বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি থেমে গেলে হাঁটা আরম্ভ করলাম হোটেলের উদ্দেশ্যে। কাল সকাল থেকেই ফরাসী কর্মকর্তাদের সাথে সভা শুরু। ১৩ ঘন্টার যাত্রার ধকলটা মোকাবেলা করতে হবে হোটেলের নরম বিছানায় নিজেকে সমর্পণ করে। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।