প্যারী-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ৩

Pari 3

সৈয়দ আলমাস কবীর: বড় হোটেলে সকালবেলার নাস্তা খাওয়াটা আমার বেশ জমে! আমেরিকান, কন্টিনেন্টাল, মিড্‌ল ইস্টার্ন, ইণ্ডিয়ান, ওরিয়েন্টাল – কতরকমেরই না পদ থাকে সেখানে প্রাতঃরাশের রসনা নিবৃত্তির জন্য! এদিক দিয়ে আমাদের দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উদারতার জুড়ি নেই। যত পশ্চিমে যাবেন, আতিথেয়তার সাথে সাথে পদের সংখ্যাও কমতে থাকবে। যে নামী হোটেলে আছি, সেখানে আতিথেয়তায় কমতি আছে বটে, তবে ইউরোপীয় মানদণ্ডে এটাই ঢের। মধু দিয়ে বিখ্যাত ফরাসী রুটি ক্রসোঁ, টমেটো কেচাপ দিয়ে স্ক্যাম্বেল্‌ড ডিম আর ম্যাপেলের সীরা দিয়ে প্যানকেক বা নরম বড়া খেয়ে নাস্তা সারলাম। বাকী যা কিছু ছিল, তা’তে শূকরমাংস থাকায় ছুঁতে পারলাম না। বরাহ-বিদ্বেষটা আমার কাছে যতটা না ধর্মীয়, ততটাই অরুচিকর। যা’হোক পেট ঠেসে খেয়ে সভায় যোগদানের জন্য প্রস্তুত হলাম।

বাংলাদেশের স্থানীয় এম্ব্যাসীর গাড়িতে করে উপস্থিত হলাম লুক্সেমবার্গ প্যালেস-এ। এক কালে প্যালেস বা প্রাসাদ হলেও এখন এটি ফরাসী দেশের জাতীয় সংসদ বা সেনেট। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজা ত্রয়োদশ লুই-এর মায়ের বাসভবন হিসেবে তৈরী হয়েছিল এই বিশাল স্থাপনাটি। আমাদের প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতি নেওয়া ছিল। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই দেখি সোনালী কারুকাজে ভরপুর দেউড়ি, আর সেখান থেকে উঠে গেছে প্রায় শ’খানেক ধাপের লাল গালিচাবৃত চওড়া সিঁড়ি। এই এত উঁচু সিঁড়ি বানানোর পিছনে একটা মজার গুজব আছে। বলা হয়, বয়োজ্যেষ্ঠ সাংসদরা এই সিঁড়ি চড়ে উপরে উঠতে উঠতে এতই হাঁপিয়ে পড়তেন, যে সংসদের মূলকক্ষে পৌঁছুনোর পর আর কোন রকম প্রতিবাদ করার তাঁদের আর দম থাকতো না! যা’হোক, আমরাও সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলাম। স্বাগতিক ফরাসী সেনেটরদ্বয় প্রাসাদের বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখালেন ফরাসী স্থাপত্যশিল্পের আর কলাবিদ্যার নৈপুণ্য। দেওয়ালের কারুকাজ আর চিত্রশৈলী দেখে তো’ মুখ হা হয়ে গেল। রাজপ্রাসাদ বলতে কল্পনায় যা ভাবি আমরা, এ বোধহয় তা’র থেকেও বেশী জমকালো। নিজের চোখে না দেখে ছবিতে দেখলে নির্ঘাত মনে হতো সেটা ফটোশপ করা! ছাদে কী করে এরা এত নিখুঁত সব ছবি আর দৃশ্যাবলী একেছিল, তা’ সত্যিই বিস্ময়কর। বিশাল এক রাজদরবারে রাখা নেপোলিয়নের ‘N’ লেখা সিংহাসন দেখে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি হলো। দেখলাম কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত ১৯৫৮-এর ৪ঠা অক্টোবরে সই করা ফরাসী সংবিধান। আমাদের দলপতি মন্ত্রী মহোদয়সহ আমরা একসাথে বেশ কিছু ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারলাম না! সংসদের মূল অধিবেশন-কক্ষে গিয়ে তো চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! সংসদের অধ্যক্ষ বা স্পীকারের আসনের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে তুর্গো, ডি-গসোউ, ল-পিতাল, কোল্‌বেয়ার, মোলী, মালীসার্ব্য, এবং পোর্‌তালেস – ফরাসীদের অগ্রজ সাতজন নেতৃবৃন্দ ও অভিভাবকদের সৌম্য মূর্তি; সামনে রয়েছে ৩৪৮ আসনের গ্যালারী। দেওয়াল, ছাঁদ আর থামের শিল্পকুশলতার কথা না-ই বা বললাম। ঘুরতে ঘুরতে আর চমৎকৃত হতে হতে আসলাম সংসদের পাঠাগারে। সেখানে বইয়ের সংগ্রহ দেখে আবারও বাকরূদ্ধ হয়ে পড়লাম! প্রাসাদের পাশেই জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে ছবির মতন লুক্সেমবার্গ উদ্যান। হাতে সময় বেশী নেই; তাই বাগানে আর যাওয়া হলো না।

সাংসদগণ আমাদের নিয়ে আসলেন প্রাসাদের খুব কাছেই অবস্থিত একটি দামী রেস্তোরাঁয়। মধ্যাহ্নভোজনের আয়োজন করেছেন তাঁরা সেখানে আমাদের সম্মানে। ভেতরের সুশোভিত সজ্জা আর টেবিলে রাখা সুক্ষ পোর্সেলিনের বাসনপত্র ও রূপোলী ছুরি-কাঁটা দেখে বুঝতে বাকি রইলো না যে ফরাসী ফাইন ডাইনিং বলতে যা বোঝায়, রেস্তোঁরাটা সে জাতেরই। ধূমায়িত নরওয়েজীয় স্যামন, ভাপা কড মাছের সাথে সেদ্ধ কড়াইশুঁটি আর আলু, আর ফরাসী শ্যু পিষ্টক বা পেস্ট্রী দিয়ে ত্রি-কোর্স ভোজন সারলাম। হালাল-হারামের বিতর্ক এড়িয়ে মাংস পরিবেশন করা থেকে দূরে থাকলেন বটে আমাদের ফরাসী বন্ধুগণ, তবে ফরাসী মদিরার কোন কমতি ছিল না সেখানে!

পেটপূজো শেষে ফিরে গেলাম সেনেট ভবনে। সেখানে আরেক সভাগৃহে বাংলাদেশ-ফ্রান্স অর্থনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। লম্বা টেবিলে মুখোমুখি বসে আলোচনা শুরু করলাম। আমার পালা এলে ফরাসীদের জ্ঞাতার্থে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে একটি উপস্থাপনা পেশ করলাম। ফরাসীরা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করে নিরতিশয় লাভবান হবে, এই প্রলোভন দেখালাম। উপস্থাপনা শেষে হাততালির প্রাবল্যে ৮ হাজার কিলোমিটারের সফরের কষ্টটা উসুল হয়ে গেল। সভা সমাপ্তির পর যথারীতি দলগত ছবি তুলে প্রাসাদ ত্যাগের উদ্যোগ নিলাম। এই ছবি তোলা নিয়ে আজকাল বেশ খানিকক্ষণ সময় যায়। আগে যখন ফিল্মওয়ালা ক্যামেরা ছিল, তখন গুণে গুণে দু’-একটা ছবির বেশী কেউ আর তুলতো না। এখন এই ডিজিটাল যুগে একই ছবি প্রায় ডজন খানেকবার তোলা হয়, তা’ও আবার একাধিক ক্যামেরায়। ছবিতে যাঁরা থাকেন, তাঁদের প্রত্যেকের মোবাইলেও একবার করে না তুললে কারও মন ভরে না! ডিজিটাল শেয়ারিংয়ের ধারণাটা কারও মাথায় তখন কাজ করে না, কিংবা কেউ প্রস্তাব করলেও অন্যরা সেটা বিশ্বাস করেন না! “যদি কপিটা না পাই তা’হলে ফেসবুকে পোস্ট করবো কী করে” – এই FOMO অনুভূতিটা কাজ করে অনেকের মনে। এই ‘Fear Of Missing Out’-এর জন্যই ছবিতে অনুপস্থিত থাকাটা আজকাল অনেকের জন্যই চরম হতাশা ও ভীতির কারণ।

হোটেলে ফিরে মুখে জল ছিটিয়ে একটু তরতাজা হয়ে নিলাম। সন্ধ্যেবেলা বাংলাদেশের মাননীয় রাষ্ট্রদূত আমাদের সম্মানে নৈশভোজনের আয়োজন করেছেন। সেখানে না গেলে রাষ্ট্রদূত মহাশয় কতটা নিরাশ হবেন জানিনা, তবে আমি যে FOMO-তে ভুগবো, তা’তে কোন সন্দেহ নেই! (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।