প্যারী-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ৪

pari 4

সৈয়দ আলমাস কবীর: প্রধান প্রাসাদের সামনে সেইন নদীর তীরে ১৯০০ সালে তৈরী হয় ‘পেতিত পালাইস’ বা ছোট প্রাসাদ, যা এখন প্যারী শহরের অন্যতম প্রধান চিত্রশালা। এরই মধ্যে রয়েছে পালিশ-বিহীন কাঠের মেঝে, অনাড়ম্বর ঝাড়বাতি-ওয়ালা এক জাঁকজমকহীন রেস্তোরাঁ। নাম ‘মিনি-প্যালাইস’। আড়ম্বরহীন হলেও শহরের উচ্চ-শ্রেণীর লোকজনের এখানে বেশ আনাগোনা। রসনাবিলাসী ফরাসীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পাওয়া মানে হলো, উঁচুদরের রুচিকর খাবার-দাবার মেলে এখানে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মহোদয় অতিশয় সজ্জন, এখানেই আমাদের বিধিবৎ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি সান্ধ্যভোজনের জন্য। ত্রি-ধারা খাদ্যতালিকা এখানেও। আর বিতর্ক এড়াতে আবারও শুধু অবিসংবাদিত মৎস্য-ব্যাঞ্জণ। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, ফরাসী ভাষায় খাবারের নাম যতটা লম্বা, খাবারের পরিমান ততটাই কম! তাই শুরুতেই যখন দেখলাম মেন্যুতে লম্বা লম্বা সব নাম, তখনই বুঝেছিলাম রাতে হোটেলে ফিরে আরেক দফা খেতে হবে। ভাগ্যিস আলুভাজার একটা বড় প্যাকেট রাখা আছে হোটেল-রুমের মিনি-বারে। মিনি-প্যালাইসে পাকস্থলী সন্তুষ্ট না হলে মিনি-বার তো’ রয়েইছে!

আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দলের সবাই হোটেলে ফিরে গেলেন। আমি বললাম পরে যাব। ভাবপ্রবণ প্যারীর রাস্তায় হেঁটে শহরটাকে কিছুক্ষণ অনুভব করতে চাইলাম। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখি ফুটপাতে, রাস্তার পাশে, এখানে ওখানে অনেকগুলো দু’-চাকার স্ক্যুটার পড়ে আছে। ছোটবেলায় পা দিয়ে ঠেলে চালানো যে খেলনা স্ক্যুটারগুলো আমরা চড়তাম, এগুলো সেরকমই; শুধু এতে ব্যাটারী সংযোজন করা আছে। একবার চলা শুরু করলে হ্যাণ্ডেলের সাথে লাগানো বোতাম বা লিভার চেপে গতি বাড়ানো যায়, পা দিয়ে ঠেলার আর দরকার হয়না। এই নবায়নযোগ্য ব্যাটারী-চালিত স্ক্যুটারগুলোতে ভূ-অবস্থান নির্ণায়ক চিপ লাগানো আছে, আর সে-সাথে আছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে চাকায় তালা দেওয়া বা খোলার ব্যবস্থা। প্রত্যেক স্ক্যুটারেই কিউ-আর কোড দেওয়া ছাপ আছে, যেটা আপনার মোবাইলে একটি বিশেষ অ্যাপ-এর মাধ্যমে স্ক্যান করে, ক্রেডিট কার্ডের বিস্তারিত দিয়ে চাকার তালা খুলতে পারেন। ব্যস, স্ক্যুটারটি আপনার! যতক্ষণ খুশী ঘুরে বেরান সেটা নিয়ে। যখন প্রয়োজন মিটে যাবে, তখন রাস্তার পাশে বা ফুটপাতের ধারে রেখে দিলেই চলবে, নিজে নিজেই ওটা লক হয়ে আপনার ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা কেটে নেবে। হেঁটে আর কতক্ষণই বা ঘুরতে পারবো! আর ট্যাক্সি করে ঘুরলে তো’ আর যেখানে সেখানে থামা যায়না, বা ভাল করে আশেপাশ দেখাও যায়না। স্ক্যুটার করে ঘোরাটা তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ আমার জন্য। চাকার তালা খুলে, স্ক্যুটার নিয়ে বেরিয়ে পরলাম প্যারীর রাস্তায়।

ঘন্টা দেড়েক ঘুরলাম রাস্তায় রাস্তায়। ইউরোপে একটু রাত হলেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। তাই গাড়ী-চাপা পড়ার ভয় ছিল না। তা’ছাড়া প্যারী সহ এখন বেশ অনেক শহরেই সাইকেলের জন্য আলাদা পথ নির্দিষ্ট আছে। সেই পথ দিয়ে ঘন্টায় ২০-২৫ মাইল বেগে ছুটে চললাম আমি। আইফেল টাওয়ার, সেইন নদী, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চত্তর, দেখতে দেখতে উপভোগ করলাম শহরটাকে। এক চত্তরে চিত্র-প্রদর্শনী চলছিল। থামলাম সেখানে; ছবি তুললাম। হঠাৎ চোখে পড়লো প্রায় ৩৮ হাজার শিল্পকর্ম বিশিষ্ট পৃথিবী-বৃহত্তম চিত্রশালা বিখ্যাত ম্যুজে ডু ল্যুভ্‌র, যেখানে সযত্নে রক্ষিত আছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি-র বিশ্বনন্দিত ‘মোনালিসা’। নিগূঢ় হাসি নিয়ে দর্শকের দিকে তাকিয়ে থাকা এই রহস্যময়ীকে দেখার সুযোগ হয়েছিল বছর তিনেক আগে। সারাদিন এই ল্যুভ্‌র ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম তখন। এর একেক কক্ষে রয়েছে একেক অমূল্য সব চিত্রকর্ম। ২২৬ বছরের পুরোন এই ল্যুভ্‌র-কে ঘিরে গল্প-ছবিও হয়েছে বেশ কিছু। মাইকেল ক্রাইটনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’-এর রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু এই গ্যালারীর অংশবিশেষে গিয়েছিলাম সে-বার। স্ক্যুটার নিয়ে এরপর গেলাম ফরাসী বিপ্লব এবং নেপোলিয়নের যুদ্ধের বিজয় খিলান ‘আক্‌খ দ্যি ত্রিয়ম্ফ’-এ। ১৬৪ ফুট উঁচু আর ১৪৮ ফুট চওড়া এই খিলানটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল ১৮৩৬ সালে। বিভিন্ন ফরাসী যুদ্ধে শহীদ হওয়া সেনাপতিদের নাম খোদাই করা আছে এর দেওয়ালে; আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শহীদদের কবর রয়েছে এর পাদদেশে। উপর থেকে পাখীর চোখ দিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এই আক্‌খ দ্যি ত্রিয়ম্ফ-কে কেন্দ্র করে প্যারী শহরের প্রধান সড়কগুলো বিকীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মহাসড়ক হলো ২৩০ ফুট প্রস্থের শ্যজ এলিজে, যেখানে প্রতিবছর ১৪ই জুলাই ফরাসী জাতীয় দিবস বাস্টিল ডে-তে সামরিক কুচকাওয়াজ হয়ে থাকে।

ব্যাটারী-চালিত স্ক্যুটারে শহর প্রদক্ষিণ করে উপস্থিত হলাম আবার আইফেল টাওয়ারের গোড়ায়। ততক্ষণে এর বাতি নিভিয়ে ফেলা হয়েছে। অন্ধকারে ও কুয়াশায় খুব ভাল করে দেখা যাচ্ছে না টাওয়ারের চূড়া। আগেরবার টিকিট কেটে লিফ্‌টে চড়ে উঠেছিলাম এর চূড়ায়। ৯০০ ফুট উপর থেকে প্যারী শহরকে উপভোগ করেছিলাম। এর মোট তিনটি ফ্লোরের দু’টিতে আছে রেস্তোরাঁ; আরেকটিতে দর্শকদের জন্য বারান্দা আর স্মারকবস্তুর দোকান। চারিপাশের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নানান ভঙ্গিমায় ছবি তুলেছিলাম তখন। টাওয়ারের গোড়ায় কিছু খাবারের দোকান আছে, যেখানে বিক্রী হয় ফরাসী পাটিসাপ্টা বা ক্রেপ। কিছু বাঙালীও কাজ করেন এখানে। একবার ক্রেপ কিনতে গিয়ে এমনই বাঙালী পেয়ে বাঙলায় কথা বলতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়েছিল! ক্রেপ-পাচক কিছুতেই বাঙলা বলবেন না আমার সাথে! আমার এক ফরাসী ভাষা জানা বন্ধু তা’র সাথে ফরাসীতে বলতে গিয়ে দেখা গেল তিনি সে ভাষাতেও যথেষ্ট অপটু। ভাঙা ইংরেজীতেই কথা বলে লেনদেন শেষ করেছিলাম তাঁর সাথে। বিদেশের মাটিতে স্বদেশীয় মানুষের সাথে নিজ ভাষায় কথা না বলা বা নিজেকে দেশী হিসেবে পরিচয় না দেওয়ার একটাই কারণ হতে পারে, তা’ হলো তিনি যে ধরণের কাজ করছেন তা’তে তিনি লজ্জিত এবং চান না যে দেশের কেউ তা’ জানুক। অন্য শহরেও আমি এ জিনিসটা লক্ষ্য করেছি। মনে আছে, ইতালীতে একবার এক বাঙালী ফুল-বিক্রেতার সাথে ছবি তুলতে চাইলে তিনি তীব্রভাবে অসম্মতি জানিয়েছিলেন; তিনি চাননি দেশের কেউ যেন ছবি দেখে তা’কে চিনে ফেলে আর দেখে যে তিনি এখানে রাস্তায় ফুল বিক্রী করেন।

আইফেল টাওয়ারের পাশেই সেইন নদী। সেখানে বড় বড় লঞ্চে করে নৌ-ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে পর্যটকদের জন্য। সাথে নানান ফরাসী খানাদানাও থাকে। নদীপথে যেতে যেতে বিভিন্ন স্থাপনার বিবরণ দেন গাইড। অল্প সময়ে ফরাসী ইতিহাসের আদ্যপান্ত জানতে এই নৌ-সফরের জুড়ি নেই। বিখ্যাত নটর ডেম গীর্জা রয়েছে এই প্যারী শহরেই। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তৈরী এই ক্যাথদ্রাল নত্র দাম-এর ৩০০ ফুট উঁচু দু’টি মিনারের একটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। অন্যটি বিধ্বস্ত হয়েছে এ বছরের এপ্রিল মাসের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে। এর আগে যখন এসেছিলাম এ শহরে, তখন বেশ কিছু সময় কাটিয়েছিলাম এখানে। অগ্নিকাণ্ডের পর বর্তমান অবস্থা দেখতে যেতে চেয়েছিলাম এই বিখ্যাত ফরাসি গথিক স্থাপনাটিতে, কিন্তু সময় হলো না এবার। প্যারী-তে রয়েছে প্রাপ্তবয়স্কদের চিত্তরঞ্জনের জন্য প্রখ্যাত ক্যাবারে শো ‘ম্যুলান রুজ’। সল্পবসনা ও নিরাবরণ নটী বিনোদনীদের সমবেত এই জাঁকজমকপূর্ণ নাচ কিন্তু একেবারেই কুরুচিপূর্ণ নয়, বরং যথেষ্ট শৈল্পিক। এজন্য দেশ-বিদেশ থেকে লোকে এসে অনেক টাকা দিয়ে টিকিট কেটে এই নাচ দেখে। ছোটদের আনন্দ দানের জন্য আছে ডিজনীল্যাণ্ড। আমেরিকা ছাড়া টোকিও, হংকং, সাংহাই ও এই প্যারীতে ডিজনীল্যাণ্ডের পার্ক অবস্থিত। ২০১৬-র বড়দিনটা আমরা কাটিয়েছিলাম এই ৪,৮০০ একরের বিনোদন উদ্যানে।

স্ক্যুটার পরিভ্রমণ শেষে যখন হোটেলে ফিরেছিলাম, ঘড়িতে তখন বেজেছিল রাত দু’টো। সকালে নাস্তা খেয়েই বেরিয়ে পড়েছিলাম বিমানবন্দরের উদ্দ্যেশ্যে। এমিরেট্‌সের গাড়ী এসে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে। আবারও সেই মস্ত এয়ারবাস ৩৮০-৮০০। প্যারী থেকে দুবাই; সেখানে থেকে ঢাকা। অতি সংক্ষিপ্ত এই সফরে কতটুকু ব্যবসায়িক অর্জন হলো জানি না, তবে অভিজ্ঞতার ঝুলি যে আরেকটু পূর্ণ হলো তা’তে কোন সন্দেহ নেই। এমনিতেই এই পর্বটা অযাচিতভাবে লম্বা হয়ে গেছে। তাই ফিরতি যাত্রাটার বিবরণ দিয়ে পাঠকের আর বিরক্তি উদ্রেক করতে চাই না। অতএব, এখানেই ইতি টানছি এ যাত্রা। বিমানে ঢোকার মুখে আমার কোট হারিয়ে ফেলা এবং তা’ পুনোরুদ্ধার সহ পথে দু’একটা যে ঘটনা ঘটেনি তা’ নয়, তবে সে’গুলো আর ডায়েরীবন্দী করলাম না। বন্ধুমহলে আড্ডা দিতে দিতে না হয় সে’সব বলা যাবে।

ওয়্যু রিভূয়া!

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।