বামনডাঙ্গার জমিদার বাড়ির শেষচিহ্ন বিলুপ্তির পথে

33

নূরুন্নবী  বাদশা (রংপুর প্রতিনিধি) সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গার সর্বানন্দ ইউনিয়নের রামভদ্র গ্রামের জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্তি হতে চলেছে।

উত্তর জনপদের বামনডাঙ্গার এ অঞ্চলে এই জমিদারদের গোড়াপত্তন কবে হয়েছিল বা কে করেছেন সে সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য এখনও নির্ধারণ করা যায়নি। তবে কথিত আছে যে, পঞ্চদশ শতকের কোন এক সময়ে সম্রাট আকবরের আমলে পরাজিত ও রাজ্যচ্যুত গৌড় বংশীয় ব্রাহ্মণ কৃষ্ণকান্ত রায় পালিয়ে এখানে আসেন এবং বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে তাঁর আমলেই বামনডাঙ্গার এই জমিদারদের নামডাক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সময়ে এই এলাকার প্রজাদের মধ্যে সর্বত্র সুখ-শান্তি এবং আনন্দ বিরাজমান ছিল। এ ছাড়া জমিদাররা সুশীল এবং ভদ্র। এ কারণেই ওই এলাকার নাম হয়েছিল সর্বানন্দ। আর সেই নামেই বর্তমানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সর্বানন্দ ইউনিয়ন, যেখানে জমিদারবাড়ি। সেই গ্রামটির নাম হয়েছিল রামভদ্র। জানা গেছে, ইংরেজ শাসনামলে ১৮৯৩ সালে কোম্পানির গর্বনর লর্ড কর্নওয়ালিশ এ দেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন চালু করলে উপরিউক্ত জমিদারী নিম্নোক্ত বংশধরগণ চিরস্থায়ীভাবে নিজের শাসন কায়েম করেন।

বামনডাঙ্গা রাজ পরিবারে অতীত বংশধরদের সঠিক নাম পরিচয় না জানা গেলেও নবম কিংবা দশম বংশধরের নাম ব্রজেশ্বর রায় চৌধুরী বলে জানা গেছে। ব্রজেশ্বর রায় চৌধুরী জমিদারের একমাত্র পুত্র ছিলেন নবীন রায় চৌধুরী। পিতার মৃত্যুর পর নবীন রায় চৌধুরী জমিদারি লাভ করেন। নবীন রায় চৌধুরীর জমিদারি আমলে এই রাজবাড়ীর নামডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর রাজত্বকালে বার্ষিক রাজস্ব ছিল ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। ১৯০২ সালে নবীন রায় চৌধুরীর দুই পুত্র শরৎ রায় চৌধুরী ও বিপীন রায় চৌধুরী জমিদারি লাভ করেন। তাঁরা দুই ভাই বড় তরফ ও ছোঁ তরফ হিসেবে জমিদারী শুরু করেন। শরৎ রায় চৌধুরীর কোন সন্তান না থাকায় বিপিন রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র কন্যা সুনীতি বালা দেবী পিতার বামনডাঙ্গার জমিদারি লাভ করেন অন্য দুই পুত্র মনীন্দ্র রায় চৌধুরী ও জগৎ রায় চৌধুরী পিতার অন্য অঞ্চলের জমিদারি লাভ করেন এবং দুই ভাই পৃথক ভাবে জমিদারি চালিয়ে যেতে থাকেন।

জমিদারি লাভের পূর্বেই সুনীতি বালা দেবীর বিয়ে হয় দিনাজপুর জেলার ভাতুরিয়ার প্রিয়নাথ পাকড়াশীর সঙ্গে। সুনীতিবালা দেবীর জমিদারি আমলে লাটের খাজনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে এবং ১৯৪৬ সালে নিলাম ঘোষণা হলে পূর্ণিয়া জেলার মহারাজা কৃষাণলাল সিংহ ক্রয় করলে সুনীতিবালা দেবীর জমিদারির বিলুপ্তি ঘটে। প্রায় ৩৬ হাজার একর জমি ছিল এ জমিদারীর অধীনে।

  জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর বড় ভাই জমিদার মনীন্দ্র রায় চৌধুরী আসামের দরংগা জেলায় চলে যান। ছোট ভাই জমিদার জগৎ রায় চৌধুরী বামনডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে থেকে যান। ১৯৬৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি বামনডাঙ্গা জমিদার বাড়িতে মারা যান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা ভারতে চলে যান। ফলশ্রুতিতে বামনডাঙ্গায় জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে রংপুর ডেপুটি কালেক্টর সাহেব জমিদারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। অস্থাবর অনেক সম্পত্তি নিলামে বিক্রয় করা হয়।


কিংবদন্তি রয়েছে সুনীতিবালা দেবীর একটি কামধেনু ছিল। কলাপাতায় করে লবণ না খাওয়ালে দুধ দিত না ঐ কামধেনু। সুনীতিবালা দেবীর বাসগৃহের ৩০ গজ দক্ষিণে ছিল দুর্গামন্দির। এর ১০০ গজ পূর্বে চোখে পড়ত পিরামিডের মতো ৩টি মঠ। যা রাজবংশের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিসৌধ বলে পরিচিত ছিল। অনেকে আবার এ মঠ তিনটিকে রাজবাড়ির হাওয়াখানাও বলে থাকেন। এ রাজবাড়িতে ছিল বাবুর দীঘি ও নয়ার হাট নামে দুটি সরোবর।

কথিত আছে নয়ার হাট দীঘিতে সারা রাত সোনার চালুন ভেসে থাকত আর বাবুর দীঘিতে বিশাল আকারের কালো পাথর ভাসত। এটি যখন ভাসত দীঘির পানির রং একেবারেই নাকি কালো হয়ে যেত। চালুন ও পাথরের ভয়ে এখনও এ দীঘিতে কেউ নামতে সাহস করে না। আরও কথিত আছে, জমিদার কন্যা সুনীতিবালা দেবী যখন শ্বশুরবাড়ি থেকে পিতার বাড়িতে আসত তখন ১০০ হাতি নিয়ে বামনডাঙ্গা জমিদারবাড়িতে প্রবেশ করতেন। তার প্রবেশ পথে এক সময় তিনি আলাইরপুর নামক স্থানে একটি সেতু ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় দেখতে পান। এক রাতের মধ্যেই সেতুটি পুনর্নির্মাণ করে তার ওপর শালু কাপড় বিছিয়ে তিনি খাল পাড় হন।  


এমন অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে বামনডাঙ্গা জমিদারবাড়ির অনেক পরিচিতি থাকলেও বর্ধিত জনসংখ্যা বাড়তি চাপে অতীতের নীরব সাক্ষী গাইবান্ধা জেলার বামনডাঙ্গা জমিদারবাড়িটির শেষ চিহ্নও এখন বিলুপ্তির পথে। রাজবাড়ির বাসগৃহ, অতিথিশালা, রাজদরবার, দুর্গামন্দির, মঠ, ট্রেজার, গো-শালার স্মৃতিবিজড়িত অবকাঠামোসমূহ ইতোমধ্যে সবই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন জমিদারদের কাচারি ঘরখ্যাত প্রাচীন ভবনটিও এলাকার কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী গ্রাস করে ফেলেছে।

অবৈধভাবে এর ভেতরে চাষাবাদ করার কারণে এর অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং মূল্যবান সম্পদ বেহাত হয়েছে অনেক আগেই। ১৯৯৯ সালে ভূমিদস্যুদের গ্রাস থেকে জমিদারবাড়ির কিছু অংশ সরকারীভাবে উদ্ধার করে ভূমিহীনদের জন্য ব্যারাক বাড়ি নির্মাণ করে দেয়।