ব্রাজিল যাত্রীর ডায়েরী –পর্ব ২

Brazil 2

সৈয়দ আলমাস কবীর: রিও-কে এরা পর্তুগীজ ভাষায় বলে “হিও”। তা’ এই ‘হিও’-র সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় জায়গাটা হলো কোপাকাবানা সমুদ্র-সৈকত, আর আমদের হোটেলটি সেই ৪ কিলোমিটার লম্বা সাদা বালুর সৈকতের ঠিক মাঝামাঝি। ভোরবেলা চোখ খুলতেই দেখি ঝকঝকে বীচ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। মুখহাত ধুয়ে হাফপ্যান্ট পরে রবারের চটি পায়ে দিয়ে ছুটলাম সেখানে। একটু হাঁটাহাঁটি করতে না করতেই অতলান্তিক এসে পা ছুঁয়ে স্বাগত জানালো। আমিও আর না ভিজে যাওয়ার প্রচেষ্টা বাদ দিয়ে অতলান্তিকের কাছে সমর্পণ করলাম। খুব শীঘ্রই প্রায় কোমড় পর্যন্ত ভিজিয়ে দিল আমাকে রিও-র সমুদ্র। হোটেলে এসে গোসল করে ফিটফাট হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম শহর দেখতে।

ব্রাজিলের জনতত্ত্ব বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। বিভিন্ন উৎসের মানুষ একত্রিত করেছে ব্রাজিলীয় সমাজকে। মূলতঃ আদিবাসী ব্রাজিলীয়দের সাথে পর্তুগীজ ঔপনিবেশিকদের এবং আফ্রিকান, ইউরোপীয়, আরব ও জাপানী অভিবাসীদের মিশ্রণে তৈরী হয়েছে এখনকার ব্রাজিল। ইংরেজরা এখানে কলোনী করেনি বলে ইংরেজী খুব একটা জানে না লোকজন। দোকানপাটে কথা বলতে, পথ চলতে মুঠোফোনের অনুবাদের অ্যাপটিই তাই ভরসা। কোপাকাবানা এলাকাটি পর্যটকদের তীর্থস্থল। দোকানপাট, হোটেল আর রেস্তোঁরায় জায়গাটি সয়লাব। ঘুরে ঘুরে বেশ ক্ষিদে পেয়ে গেল। খুঁজে বের করলাম এখানকার নামকরা রেস্তোঁরা ‘চুরাস্কারিয়া প্যালেস’। ব্রাজিলীয় (ও দক্ষিণ আমেরিকী) কাবাবকে বলে চুরাস্কো, আর যেখানে এ ধরণের কাবাব পাওয়া যায়, তাকে বলে চুরাস্কারিয়া। এ ধরণের রেস্তোঁরার বিশেষত্ব হলো পেট-চুক্তিতে খাওয়া। আপনি বসে থাকবেন, আর একেক রকমের কাবাব নিয়ে এরা আসতে থাকবে কিছুক্ষণ পর পর। গরুর মাংস, ভেড়ার মাংস, মুরগীর মাংস, শুয়োরের মাংস – হরেক ধরণের মাংসের হরেক ধরণের কাবাব। সাথে অন্যান্য খাবারের সমাহারও থাকে এই কাবাব ছাড়া। দু’ঘন্টা ধরে আমিষ-পূজো করে মধ্যাহ্নভোজে শেষ করলাম।

সুগারলোফ পর্বতচূড়া থেকে তার-পালকি বা কেবল-কারে চড়ে যাওয়া যায় পাশাপাশি আরও দু’টো পাহাড়ে। রিও শহরের বিশেষ দ্রষ্টব্যের অন্যতম এই সুগারলোফ। অগত্যা পরবর্তী গন্তব্য সেখানেই। হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি। তা’ ঐ বৃষ্টির মধ্যেই লাইনে দাঁড়িয়ে পালকিতে উঠলাম। বেশ খাড়া হলেও মিনিট পাঁচেকের পথ। এই চূড়ায় রয়েছে বেশ কিছু উৎকৃষ্ট রেস্তোঁরা, হালফ্যাশনের দোকান আর গান-বাজনা করার জন্য একটা বড় হল। এখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে, পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলে আরেকটা পালকিতে চড়লাম, যেটা নিয়ে গেল অন্য একটা পর্বতের চূড়ায়। এখানেও রেস্তোঁরা, পানশালা আর বসার চত্বর। পুরো রিও ডি জেনেরিও শহরটা দেখা যায় এখান থেকে। সুদূরে রয়েছে রিও-র বিমানবন্দরের রানওয়ে; কয়েক মিনিট পর পর উড়োজাহাজ সেখানে নামছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। অসংখ্য প্রমোদতরী ভাসছে রিও-র প্রণালীগুলোতে। কোপাকাবানা ও ইপানামা সৈকতও দেখা যাচ্ছে এত উঁচু থেকে। প্রায় অর্ধশত ছবি তুলে আবার কেবল-কার দিয়ে নামার পালা। পুরো ব্যাপারটা সুন্দর, কিন্তু অভিনব কিছুই নয়। তা’ও হাজার হাজার পর্যটক ভীড় করছে এখানে প্রতিদিন। আসলে সব কিছুই বিপনন। কার্যকর মার্কেটিং করতে হলে সঠিক প্যাকেজিং দরকার। আর এরা এটা বেশ সফলভাবেই করেছে।

সন্ধ্যেবেলা হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণের বিশ্রাম। অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে কোপাকাবানা সৈকত ভরে উঠছে দলে দলে আসা আমোদপ্রেমীতে। সমুদ্র সৈকতের সাথেই কিছুদূর পর পর পানাশালা – কোনটাতে স্পেনীয় এবং পর্তুগীজ গান বাজছে, আর কোন কোনটাতে ছোটখাট গাইয়ের দল নিজেরাই গলা ফাটিয়ে গান ধরেছে। লক্ষ্য করলাম, যেখানে লাইভ গান হচ্ছে, লোকজনের আগ্রহও বেশী সেখানে। বেসুরো হলেও কিছু যায় আসে না, কারণ এদের সাজগোজ, নাচানাচি ইত্যাদি মিলিয়ে বেশ জমে যায় ব্যাপারটা। ঐ যে, প্যাকেজিং!

সৈকতের ধার ধরে হাটতে থাকলাম। আশু কার্নিভালের কারণে অনেকে সাময়িক ব্যবসায় করছে সাজগোজের জিনিসপত্র বিক্রী করে। ফুটপাতের ওপরেই চাদর বিছিয়ে বসে গেছে তা’রা। গায়ে-গালে লাগানোর চুমকি থেকে শুরু করে, টুপি, প্লাস্টিকের ফুলের মালা, পোষাক সবই পাওয়া যাচ্ছে এই ফুটপাতে। টুকিটাকি জিনিস কিনে, কেনাকাটার ভুতকে শান্ত করে হোটেল-মুখো হলাম আবার।। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।