মেলবোর্ণ-যাত্রীর ডায়েরী –পর্ব ৩

Melborn 3

সৈয়দ আলমাস কবীর: মেলবোর্ণ শহরের মধ্যেই অবস্থিত স্যুইনবার্ণ ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। আমার রাজকন্যাটি চার মাসের জন্য এখানে পড়তে এসেছে। সকাল থেকেই বেশ রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ দেখে ঠিক করলাম আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরটা ঘুরে দেখবো। সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠগুলোতে ছাত্রছাত্রীরা বসে আসছে। কিছু ছেলেমেয়ে লেখাপড়া করছে, আবার কিছু আড্ডা মারছে। কেউবা সটান শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে। ক্যাম্পাস-ভ্যান রয়েছে শিক্ষার্থীদের বহন করার জন্য। ভবনগুলো আধুনিক স্থাপত্যশিল্পে নির্মিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়টির বয়স ১১১ বছর। “শিক্ষার মাধ্যমে অর্জন” — এই আদর্শে প্রায় ২৪ হাজার বিদ্যার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি চারটি ক্যাম্পাসে পরিচালিত হচ্ছে, যার মধ্যে একটি আবার মালয়শিয়ায় অবস্থিত।

এখানে দোকানপাট সবকিছু বন্ধ হয়ে যায় বিকেল ৫টার মধ্যে। অফিসের পাট চুকিয়ে যে বাজারঘাট করবেন, তা’র জো নেই। যুক্তিটা হলো, দোকানীদেরও তো ঘর-সংসার আছে। তা’রাও বাড়ী ফিরতে চায় সময় মত; বাড়ী ফিরে পরিবারের সাথে সময় কাটাতে চায়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বিলেত-ইউরোপেও এই রীতি ছিল। ক্রমশঃ মার্কিন পূঁজিবাদ আর ভোক্তাবাদের ছোঁয়া লেগে এখন সেখানে কমপক্ষে রাত আটটা অবধি দোকান খোলা থাকে। আসলে এদেশে জনসংখ্যা এত কম যে, একাধিক শিফ্‌টে পালা করে লোকে কাজ করবে, সে উপায় নেই। লোকবলের অভাবে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের সাহায্যে অনেক কাজ করিয়ে নিতে হয় এদের। বড় দোকানগুলোতে ক্যাশিয়ার নেই; ক্রেতা নিজেই চেক-আউট মেশিনে জিনিসপত্র স্ক্যান করে, ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে বেড়িয়ে আসে। পেট্রোল-পাম্পে নিজেকেই গাড়ী থেকে নেমে তেল ভরে নিতে হয়। বাড়ীর গেট/দরজা খোলার দাড়োয়ান নেই; রিমোট-কন্ট্রোল গেট আপনি নিজেই অপারেট করবেন। আরে ভাই, আমাদের দেশে ২৬ লক্ষ শিক্ষিত বেকার ঘরে বসে ঝিমোচ্ছে। এদের কয়েকজনকে নিয়ে গিয়ে ক্যাশিয়ারের কাজে, দাড়োয়ানের কাজে, পেট্রোল ভরার কাজে লাগিয়ে দিলেই হয়! আর জায়গারও তো অভাব নেই এখানে। হাজার হাজার মাইল জমি খালি পড়ে আছে এদেশে!

সূর্যাস্তের পর আর কিছু করার নেই। ঠিক করলাম, ইয়ারা নদীর ধারে হাঁটবো। উত্তর এবং দক্ষিণ, দু’ধার ঘেঁষেই লম্বা হাঁটার রাস্তা। একে বলে বোর্ডওয়াক। এই বোর্ডওয়াকের ওপর রয়েছে নানান রন্ধন সংস্কৃতির আর প্রণালীর বাহারী সব রেস্তোঁরা আর পানশালা। নদীর উভয় তীরেই বড় বড় বাণিজ্যিক ভবন। রাতের আকাশের পটভূমিতে ভবনগুলোর বাতিগুলো নক্ষত্রের মত জ্বলছে। রঙীন নিয়নের আলো ইয়ারার বুকে পড়ে এক অদ্ভূত নৈস্বর্গিক ছ্বটার সৃষ্টি হয়েছে। বোর্ডওয়াকের রেলিং-এ হেলান দিয়ে পানিতে আলোর প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। বাতাসহীন স্থির পানির ওপর আকাশচুম্বী দালানগুলোর প্রতিচ্ছায়া দেখলে হঠাৎ মনে হয় যেন, নদীর গর্ভেও পাতালগামী আরেক সেট দালান রয়েছে। এই সুন্দর আলোআঁধারিতে কয়েকটা ছবি তোলা তো চাই-ই চাই! অঙ্কলক্ষ্মীকে সাবজেক্ট বানিয়ে, মোবাইল ফোনের ক্যামেরার বিবিধ কারসাজি পরখ করতে করতে বেশ ক’টি ছবি তুলে স্মৃতিটাকে পাকা করে রাখলাম।

ঘুরতে ঘুরতে রাত ১০টা বাজিয়ে ফেললাম। পেটে তখন ক্যাঙ্গারু ডন-বৈঠক দিচ্ছে। বাইরে টাঙানো খাদ্যতালিকা দেখে পছন্দের ভোজনালয় বেছে নিতে নিতে আরও খানিকক্ষণ দেরী হলো। জীভে জল আনা কিছু খাবারের নাম দেখে একটাতে ঢুকতে গিয়ে দেখি হেঁশেল বন্ধ করে দিয়েছেন তা’রা। অগত্যা পাশের রেস্তোঁরায় হানা দিলাম। এখানে একই অবস্থা। একে একে সবগুলো ভোজনশালায় ঢুঁ মেরে বুঝলাম, এদের সবার রান্নাঘর বন্ধ হয়ে গেছে; বাবুর্চীরা বাসন-কোসন ধুয়ে-মুছে বাড়ী চলে গেছে! এখন উপায়? পেটের ক্যাঙ্গারু ততক্ষণে বক্সিং-বক্সিং খেলা শুরু করে দিয়েছে। উপায়ন্তর না দেখে ঠিক করলাম কাছাকাছি ‘চায়না-টাউন’ আছে, সেখানেই যাই। পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরেই একটা ‘চায়না-টাউন’ থাকে। চীনেরা এই জায়গায় নানান রেস্তোঁরা, দোকানপাট, ব্যবসায়-বাণিজ্য ইত্যাদি বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। এসব জায়গায় গেলে মনে হয়, যে যেন চীনদেশেরই কোন এক এলাকা এটা। এমনিতেই মেলবোর্ণ তথা সারা অস্ট্রেলিয়াতেই চীনেদের সংখ্যা অনেক বেশী। আর চায়না-টাউনে তো কথাই নেই। আমার স্ত্রী মনে মনে বেশ খুশী। চীনে খাবারের প্রতি তাঁর সদাই বড় আকর্ষণ। আমি আবার উল্টো।

 চীনেদের খাবার-দাবার খুব একটা আমার ধাতে সয় না। মনে মনে তাড়াতাড়ি বাড়ী চলে যাওয়া বাবুর্চীগুলোর পিণ্ডি চট্‌কাতে চট্‌কাতে এলাম চীনে-পাড়ায়। পর পর অনেকগুলো বিকট গন্ধ-বিশিষ্ট চীনে রেস্তোঁরা রেকি করতে করতে হঠাৎ একটা গ্রীক ভোজনালয় চোখে পড়লো। চীনে খাবার এড়াবার এটা একটা বড় সুযোগ! স্ত্রীকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে ঢুকে পড়লাম সেখানে। অবশেষে অস্ট্রেলীয়দের দেশে চায়না-টাউনে এসে গ্রীক রেস্তোঁরায় বসে দুই ভেতো বাঙালী স্যুভ্‌লাকি আর মুসাকা খেয়ে পেটের আগুন নিবারণ করলাম। ক্যাঙ্গারু মহাশয়ও শান্ত হলেন। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।