মেলবোর্ণ-যাত্রীর ডায়েরী –পর্ব ৬

Melborn 6

সৈয়দ আলমাস কবীর: দক্ষিণ গোলার্ধে শেষ দিন আজ। মাস খানেক আগেও এই ভূ-গোলার্ধে এসেছিলাম, তবে পৃথিবী-পৃষ্ঠের উল্টো দিকেঃ দক্ষিণ আমেরিকায়। চলে যাবো বলেই হয়তো মেলবোর্ণের আকাশ আজ মেঘাচ্ছন্ন। তারপরও শহরকেন্দ্রটা আরেকবার ঘুরে দেখবো বলে মনস্থির করলাম। বিমানবন্দরে যেতে হবে মধ্যরাতে। হাতে তাই প্রচুর সময়।

ফেডারেশন চত্ত্বরে র‍্য়েছে অস্ট্রেলীয় চলচিত্র ও টেলিভিশনের ওপর উৎসর্গকৃত একটি যাদুঘর। ছায়াছবি-জগতের মাইলফলক স্বরূপ বিভিন্ন ঘটনা, অস্ট্রেলীয় শিল্পীদের হলিউড বিজয় ও আনুসাঙ্গিক গল্প নিয়ে এই যাদুঘরের উপস্থাপনা। ঘুরে দেখতে দেখতে ‘ক্রোকোডাইল ডাণ্ডি’, ‘ম্যাড ম্যাক্স’, ‘নেইবারস্‌’ সহ ছোটবেলায় দেখা বেশ কিছু অস্ট্রেলীয় ছবির স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম। পাশেই আর্ট ন্যুভো স্থাপত্য-শৈলীতে নির্মিত মেলবোর্ণের সাংস্কৃতিক আইকন ফ্লিন্ডার্‌স স্ট্রীট স্টেশন। অস্ট্রেলিয়ার সর্ববৃহৎ এই রেলস্টেশনটির নির্মান নিয়ে একটি মজার গুজব চালু আছে। ঊনিশ শতকের শেষভাগে মেলবোর্ণ আর বোম্বাই শহরের জন্য দু’টি বড় রেলওয়ে স্টেশন তৈরীর সিদ্ধান্ত নেয় বৃটিশরা।

জেমস ফসেট এবং এইচ পি সি অ্যাশওয়ার্থ ৫০০ পাউণ্ডের পুরস্কার জিতেছিলেন মেলবোর্ণের জন্য নকশা বানিয়ে। পরবর্তীতে তাঁরা নামকরা স্থপতি ফ্রেডেরিক স্টিভেন্স-এর কাছে নকশাটি পাঠান কিছু পরিবর্ধনের জন্য। স্টিভেন্স একই সময়ে বোম্বাইয়ের স্টেশনটির নকশা তৈরী করছিলেন। মেলবোর্ণে চুড়ান্ত নকশা পাঠানোর সময় ভুলবশতঃ খাম দু’টি অদল-বদল হয়ে যায়। আর ফলে বোম্বাইয়ের ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস (বর্তমান নাম: ছত্রপতি শিবাজী টার্মিনাস) নির্মিত হয় মেলবোর্ণের মূল পরিকল্পনায়, আর ফ্লিন্ডার্‌স স্ট্রীট স্টেশনটি তৈরী হয় বোম্বাই শহরের নকশা অনুযায়ী।

শেক্সপিয়ারের রোমিও-জুলিয়েট-এর অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি ‘ওয়েস্ট-সাইড স্টোরী’ নাটকটি থিয়েটারের মক্কা বলে খ্যাত ব্রডওয়েতে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। নিউ ইয়র্কের উত্তর-পশ্চিম অংশের পটভূমিতে তৈরী সেই গীতিনাট্যটি ইদানিং মেলবোর্ণে মঞ্চায়িত হচ্ছে। টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া (১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত) হলেও অগ্রীম না কাটলে জায়গা পাওয়া যায়না! আমার কন্যাটির অনুরোধে অনেক আগে থেকেই তাই আজ ম্যাটিনি শো’র টিকিট কেটে রেখেছিলাম। শহর ঘুরতে ঘুরতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল। কোনমতে কিছুটা দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে মিনিট তিনেক হাতে থাকতে হাজির হলাম মেলবোর্ণ আর্ট সেন্টারে। আর একটু দেরী হলেই দরজা বন্ধ করে দিত এরা। নাটক একবার শুরু হয়ে গেলে আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয়না হলে। কারণ তা’তে দর্শক এবং শিল্পী উভয়েরই মনোযোগ বিঘ্নিত হতে পারে। শিল্পীদের অনবদ্য অভিনয়-কৌশল আর নিজেদের গলায় গাওয়া গান ছিল অবাক করার মত। দু’ঘন্টা ধরে মন্ত্রমুগ্ধের মত দুই মাস্তান দলের রেষারেষির যাতাকলে পড়া দুই প্রেমিক-প্রেমিকার প্রণয়কাহিনী দেখে মুগ্ধ হলাম। পয়সা যে উসুল হয়েছিল তা’ বলতেই হবে।

আগেই বলেছিলাম, এখানে দোকানপাট সব বন্ধ হয় বিকেল ৫টার মধ্যেই। কিন্তু, কুইন ভিক্টোরিয়া নাইট মার্কেট খোলে সন্ধ্যে ৬টা থেকে। আনুমানিক বিঘা তিনেক জায়গায় ছাউনি দিয়ে তৈরী এই সান্ধ্য-হাট। ছোট ছোট বিক্রেতারা টেবিল-চেয়ার নিয়ে বসে পড়ে তা’দের জিনিসপত্র নিয়ে। সাধারণতঃ হাতে বানানো জিনিসই পাওয়া যায় এখানে। আজ বিভিন্ন ধরণের ইউরোপীয় খাবারের প্রদর্শনী চলছে হাটে। নানান দেশের রন্ধন-কৌশলে প্রস্তুত খাবারের দোকানগুলোর সামনে লাইনের দৈর্ঘ্য বিচার করলে একটা প্রতিযোগিতাও বলা যেতে পারে একে! এখানেই হালকা কিছু খেয়ে বিমানবন্দরে যাবো ঠিক করলাম। আজ সকালে বেরোনোর সময়েই ভাড়া করা ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়ে এসেছি। বাক্স-পেটরা সব গাড়ীতেই আছে।

অবশেষে অস্ট্রেলিয়া ত্যাগের সময় এসে গেল। আমাদের রাজকন্যাটিকে তা’র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীনিবাসে নামিয়ে দিয়ে বিদায় নিলাম। এই মুহূর্তটা আমার জীবনে বেশ ক’বার এসেছে। ছেলেমেয়েকে দূরদেশে রেখে আসাটা যেমন কষ্টের, তেমন ভীতিকরও। কেমন একটা অদ্ভুত আশঙ্কা থেকে যায় মনে; তা’ সে যত বড়ই হয়ে যাক না কেন বাচ্চাগুলো! ভালো করে খাওয়া দাওয়া করো, শীতের কাপড় যথেষ্ট পরো, রাতে একা একা বেড়িও না, ইত্যাদি উপদেশ দিতে দিতে অশ্রুশিক্ত বিদায় নিলাম আমরা। এরপর ভাড়াকরা গাড়ী ফেরৎ দেওয়ার পালা। বিমানবন্দরে যথাস্থানে গাড়ীটাকে রেখে মালপত্র ঠেলাগাড়ীতে চাপিয়ে টার্মিনালে ঢুকে পড়লাম। বড় বাক্সগুলো মালয়েশিয়া বিমানকর্মীদের কাছে সপে দিয়ে বিদায়ী অভিবাসন আর সুরক্ষা কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করে বাহারী শুল্কমুক্ত দোকানগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো একটি উপাসনালয়। যার যার ধর্ম অনুযায়ী এই কক্ষে গিয়ে প্রার্থণা করতে পারে যাত্রীরা। অস্ট্রেলীয়দের উদার মনের পরিচয় মিললো এই যাবার বেলা!

বিমানে উঠে সটান শুয়ে পড়লাম। ঘুমিয়ে নিতে হবে আট ঘন্টার পথটা। তারপর কোয়ালালামপুর থেকে সকালে ঢাকার পানে যাত্রা। তখন জেগে থাকতে হবে, নইলে জেট-ল্যাগে ধরবে বাড়ী ফিরে। ডায়েরী লেখা আপাততঃ শেষ এখানেই। কাল থেকে আবার শুরু হবে কর্মযুদ্ধ।

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।