মেলবোর্ণ-যাত্রীর ডায়েরী – পর্ব ১

Melborn 1

সৈয়দ আলমাস কবীর: যাত্রাবিরতি সহ প্রায় ১৪ ঘন্টার পথ পেরিয়ে কোয়ালালামপুর হয়ে কোয়ালার দেশ অস্ট্রেলিয়ায় এসে পৌঁছেছি গতরাতে। এবারের সফর শুধু মেলবোর্ণ শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আমার কন্যাকুমারী এখানে লেখাপড়া করতে এসেছে মাস চারেকের জন্য বিনিময়-ছাত্রী হিসেবে। স্ত্রী-পুত্রসহ তার সাথে কিছুটা সময় কাটাতে এসেছি।

প্রায় পুরোটা মহাদেশ জুড়েই এই দেশ। সাথে ছিটেফোঁটা হিসেবে আছে নিউজিল্যাণ্ড আর পাপুয়া নিউ গিনি এই অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে। অস্ট্রেলিয়া দেশটির আয়তন ৭৬,৯২,০০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ ৫২টা বাংলাদেশ অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে এর মধ্যে! আর সেখানে জনসংখ্যা মোটে ২.৫ কোটি, বাংলাদেশের ৭ ভাগের এক ভাগ! রাজনৈতিক সীমারেখামুক্ত বিশ্ব কবে হবে তাই মাঝে মাঝে ভাবি!

২০১৪-তে এম এইচ ৩৭০ বিমানের নিখোঁজ হওয়ার পর এই প্রথমবারের মত মালয়েশিয়ার বিমানে চড়লাম। বুকটা একটু দুরু দুরু করছিল, মিথ্যা বলবো না। কিন্তু মালয় বিমানবালাদের আতিথেয়তায় সব ভয় ভুলে গেলাম। একটু বেশীই যত্ন-আত্তি করছিল ওঁরা। চীনেবাদামের চাটনি দিয়ে মালয় সা’তে খেয়ে মনটা খুশী খুশী হয়ে গিয়েছিল। মুরগীর টিক্কা মাসালা থেকে বীফ স্টেক, কত কি যে পরিবেশন করলেন তাঁরা! হারানো সুনামটুকু ফিরে পাওয়ার অবিরাম চেষ্টাটা বেশ বোঝা যাচ্ছিল।

দক্ষিণ গোলার্ধের আবহাওয়া আমাদের ঠিক উল্টো। গ্রীষ্ম শেষ হয়ে শীত আসি আসি করছে এখানে। হেমন্তকাল বলা যেতে পারে এসময়টাকে। দিনে গরম, রাতে হালকা ঠাণ্ডা। বিমানবন্দরে নেমে অভিবাসন পরীক্ষার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। আজকাল এরা পাসপোর্টে ভিসার ছাপ লাগায় না। ইলেক্ট্রনিক ভিসায় সব তথ্য সার্ভারে জমা থাকে, শুধু পাসপোর্ট স্ক্যান করলেই ইতিবৃত্ত সব বেড়িয়ে আসে। অভিবাসন জানালায় সময় লাগলো এক মিনিটেরও কম! এরপর আরেক পুল সিরাত: অস্ট্রেলীয় শুল্ক-বিভাগ! এমনিতেই এদের শুল্ক কর্মকর্তারা বেজায় খুঁতখুঁতে।

আর খাবার-দাবার সাথে থাকলে তো কথাই নেই! ভাবছিলাম কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন! শুল্ক-পরিদর্শকের কেন জানি মনে হল যে আমরা খাবার-দাবার বা বেআইনী কিছু আনতেই পারিনা! তাই কিছু না জিজ্ঞেস করেই ছেড়ে দিলেন। গাড়ী ভাড়া করলাম এক সপ্তাহের জন্য। বাংলাদেশের গাড়ীচালকের অনুমতিপত্র (ড্রাইভিং লাইসেন্স) দেখে একটু অবাক হয়েছিলেন বৈকি কাউন্টারের মহিলাটি। বুঝলাম আমদের দেশ থেকে এসে খুব একটা কেউ এখানে গাড়ী ভাড়া করেন না। বিদেশে গাড়ী চালানোটা আমার ধাতে সয়ে গেছে। আর ভূ-অবস্থান নির্ণায়ক (জিপিএস) যন্ত্র যদি সাথে থাকে, তা’হলে রাস্তাঘাট চেনাটাও কোন ব্যাপার না। বিমানবন্দর থেকে আধ-ঘন্টা দূরে শহরের মাঝখানে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে রেখেছিলাম আগে থেকেই। গাড়ী নিয়ে সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত ১০টা বাজলো।

আমার কন্যাটি মাংসের কীমা দিয়ে স্প্যাগেটি বানিয়ে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। অনেকদিন পর মেয়েকে পেয়ে খিদে ভুলে গিয়েছিলাম আমরা। জমে থাকা আদর আর গল্প করেই অনেক রাত হয়ে গেল। অতঃপর মেয়ের অমৃতসম রান্না খেয়ে ঘুমের দেশে পাড়ি জমালাম। (চলবে)

লেখকঃ সৈয়দ আলমাস কবীর, প্রেসিডেন্ট, বেসিস।