শ্রীমঙ্গলের বধ্যভূমি ও মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১

শ্রীমঙ্গলের-বধ্যভূমি

মনজুরুল ইসলাম (মৌলভীবাজার প্রতিনিধি) শ্রীমঙ্গলের ‘বধ্যভূমি ৭১’ এখনআকর্ষণীয়পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে কয়েকবছরধরেএখানকার ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কে ঘিরে দেশ-বিদেশের পর্যটকসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসু ও দর্শনাথীরা আসছেন। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত বধ্যভূমিতে ২০১০ সালে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের পর ঈদ, দুর্গাপূজাসহ বিশেষ দিনগুলোতে ও ছুটির দিনে পর্যটকের ঢল নামে। এছাড়াও প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা আসেন বধ্যভূমি দেখতে।শ্রীমঙ্গলে শহরের ভানুগাছ সড়কে বিজিবি’র সেক্টর হেড কোর্য়াটার সংলগ্ন বটকুঞ্জের নিচ দিয়ে প্রবাহিত ভুরভুরিয়া ছড়ার পাশে এর অবস্থান। সম্প্রতি এখানে পর্যটকদের সুবিধার্থে নির্মিত হয়েছে ‘সীমান্ত ৭১ ফ্রেশ কর্নার’সহ মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১’।

এখানে একটি স্মৃতি পাঠাগার নির্মাণ পরিকল্পনাধীন রয়েছে। স্মৃতি পাঠাগারে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসসহ স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও শহিদদের তালিকা সংরক্ষণ করা হবে।একাত্তরের ২৫ মার্চের কালোরাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক-হানাদার বাহিনী। সারাদেশে চলে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ। পাক-হানাদারবাহিনীর এসব নৃশংসতার চিহ্ন সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পর্যটন শহর ও চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলেও এমন বধ্যভূমি রয়েছে অনেক। ভুরভুরিয়া ছড়ার এই বটকুঞ্জের নিচে পঞ্চাশের দশকে জনৈক সাধুবাবা বসতেন। সাধন-ভজন করতেন। তখন থেকে এটি সাধুবাবার থলি হিসেবে সমধিক পরিচিত ছিল। বধ্যভূমির অদূরে লেবার ওয়েলফেয়ার অফিস ও হবিগঞ্জ সড়কে ওয়াপদা রেস্ট হাউজে ছিল পাকহানাদার বাহিনীর টর্চার সেল।

পাকহানাদার বাহিনী চা-শ্রমিক, নিরীহ নিরস্ত্র মানুষ, বিভিন্ন স্থানে আটক মুক্তিযোদ্ধাসহ সন্দেহভাজন অসংখ্য মানুষকে এই টর্চার সেলে নির্যাতন শেষে হত্যা করে এই ছড়ার চরে মরদেহ পুঁতে রাখতো। শ্রীমঙ্গলে ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতির স্মরণে ‘মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১’ নামের এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয় প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা। ভাস্কর্য শিল্পী কাজল আচার্য্য এটি নির্মাণ করেন। এতে সময় লাগে ৪৫ দিন। শ্রীমঙ্গল শহরের ভানুগাছ রোডে অবস্থিত বনবিভাগ কার্যালয়ের বিপরীতে এবং বিজিবি’র সদর দপ্তর সংলগ্ন বটকুঞ্জের নীচ দিয়ে প্রবাহিত ভুরভুরিয়া ছড়ার চরে পাক হানাদার বাহিনী চা শ্রমিক, নিরীহ নিরস্ত্র মানুষ , বিভিন্নস্থানে আটক মুক্তিযোদ্ধাসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে মরদেহ পুতে রাখতো। পাক বাহিনীর নৃশংসতার চিহ এই বধ্যভূমিটি স্বাধীনতার পর থেকে অযত্নে আর অবহেলায় পড়েছিল।

২০১০ সালের শেষের দিকে এ বধ্যভূমিতে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘ বধ্যভূমি ৭১’। ১৬ ডিসেম্বর উদ্বোধন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এখানে নির্মিত হয় মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ‘মৃত্যুঞ্জয়ী ৭১’। ২০১০ সালের শেষ দিকে এই বধ্যভূমিটির রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নে ১৪ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. নূরুল হুদা উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তিনি একটি খসড়া পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করেন।

নকশাটি তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দের কাছে তুলে ধরেন। পরিকল্পনাটি সকলেই সাদরে গ্রহণ করেন। পরে অনেকেই এ মহতী কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এরই ধারাবাহিকতায় এ বধ্যভূমিতে নির্মিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘বধ্যভূমি ৭১’। ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর এ স্মৃতিস্তম্ভের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিস্তম্ভ ও একাত্তরের স্মৃতি বিজরিত বধ্যভূমিটি দেখতে মানুষ আসতে থাকেন এখানে। ধীরে ধীরে এ স্থানটি এখন আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে এখানে পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ঈদ ও পুজোসহ বিভিন্ন ছুটির দিনগুলোতে হাজার হাজার মানুষের পদভারে মুখর হয়ে উঠে এ বধ্যভূমিটি।